আইনশিক্ষা

অ্যালিমনি কি? স্বামী এটি কি দিতে বাধ্য? কী বলছে আইন ও সুপ্রিম কোর্টের জাজমেন্ট

অ্যালিমনি (Alimony) বা ভরণপোষণ: হিন্দু আইন অনুসারে একটি বিশদ প্রতিবেদন

অ্যালিমনি (Alimony), যা বাংলায় ভরণপোষণ বা খোরপোশ নামে পরিচিত, হলো বিবাহবিচ্ছেদ বা আইনি বিচ্ছেদের পর এক পক্ষকে অন্য পক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত আর্থিক সহায়তা। হিন্দু বিবাহ আইন, ১৯৫৫ (Hindu Marriage Act, 1955) এর দুটি প্রধান ধারা, ধারা ২৫ (Section 25) এবং ধারা ২৪ (Section 24), এই ভরণপোষণের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো সেই পক্ষকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া, যিনি বিবাহবিচ্ছেদের কারণে নিজেকে আর্থিকভাবে দুর্বল বা নির্ভরশীল মনে করেন এবং তাঁর জীবনযাত্রার মান বজায় রাখতে সক্ষম নন।


১. হিন্দু বিবাহ আইন অনুসারে ভরণপোষণের প্রকারভেদ

ক) অন্তর্বর্তীকালীন ভরণপোষণ (Interim Maintenance) – ধারা ২৪

এই ধারার অধীনে, মামলার চলাকালীন সময়ে (Pendente lite) যে কোনো পক্ষ ভরণপোষণের দাবি করতে পারে, যদি সে প্রমাণ করতে পারে যে তার নিজের জীবনধারণ ও মামলার খরচ বহনের জন্য পর্যাপ্ত আয় নেই। এটি মামলার রায় না হওয়া পর্যন্ত প্রযোজ্য।

খ) স্থায়ী ভরণপোষণ এবং মূলধন (Permanent Alimony and Maintenance) – ধারা ২৫

আদালতের পক্ষ থেকে বিবাহবিচ্ছেদ বা আইনি বিচ্ছেদের রায় ঘোষণার পর এই ভরণপোষণ কার্যকর হয়। এটি হতে পারে:

  • এককালীন অর্থ প্রদান (Lump-sum Payment): একবারে বিপুল পরিমাণ অর্থ দেওয়া।

  • মাসিক বা পর্যায়ক্রমিক অর্থ প্রদান (Periodical Payment): প্রতি মাসে বা নিয়মিত বিরতিতে অর্থ প্রদান।

২. ভরণপোষণ নির্ধারণের মাপকাঠি

আদালত ভরণপোষণের পরিমাণ নির্ধারণের সময় উভয় পক্ষের জীবনযাত্রার মান, প্রয়োজন, আর্থিক অবস্থান, আয় এবং আচরণের মতো একাধিক বিষয় বিবেচনা করে। সাধারণভাবে, কোনো নির্ধারিত সূত্র নেই, তবে আদালত চেষ্টা করে যেন গ্রহীতা তাঁর বিবাহের সময়কার জীবনযাত্রার মান বজায় রাখতে পারেন।

একটি সাধারণ নির্দেশিকা অনুসারে, মাসিক ভরণপোষণের পরিমাণ সাধারণত প্রদানকারী পক্ষের মোট মাসিক আয়ের এক-তৃতীয়াংশ (1/3rd) বা তার বেশি হতে পারে। এককালীন অর্থ প্রদানের ক্ষেত্রে এটি সাধারণত প্রদানকারী পক্ষের সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ (1/5th) থেকে এক-তৃতীয়াংশ (1/3rd) পর্যন্ত হতে পারে, যদিও এটি সম্পূর্ণরূপে আদালতের বিবেচনার উপর নির্ভরশীল।


৩. সুপ্রিম কোর্টের ল্যান্ডমার্ক জাজমেন্ট এবং পর্যবেক্ষণ

ভারতীয় আইনি প্রেক্ষাপটে ভরণপোষণের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের একাধিক রায় দিকনির্দেশক হিসেবে কাজ করেছে।

ক) কল্যাণ দে বনাম মমতা দে (Kalyan Dey Chowdhury vs. Rita Dey Chowdhury – 2017)

  • পর্যবেক্ষণ: এই মামলায় সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে, ভরণপোষণের দাবিদার পক্ষকে তার স্বামী বা স্ত্রীর মোট মাসিক আয়ের ২৫% পর্যন্ত মাসিক ভরণপোষণ হিসেবে দেওয়া যেতে পারে। তবে, এটি একটি নির্দেশিকা মাত্র এবং প্রতিটি মামলার তথ্য ও পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে এই হার পরিবর্তিত হতে পারে।

খ) রজনীশ বনাম নেহা (Rajnesh vs. Neha – 2020)

  • পর্যবেক্ষণ: এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রায়। সুপ্রিম কোর্ট ভরণপোষণ সংক্রান্ত মামলার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এবং দ্রুততা আনতে বেশ কিছু নির্দেশিকা জারি করে। এর মধ্যে প্রধান হলো—

    • উভয় পক্ষকেই তাদের সম্পূর্ণ সম্পদ এবং আয়ের হলফনামা (Affidavit of Assets and Liabilities) দাখিল করা বাধ্যতামূলক।

    • আবেদন দায়েরের তারিখ থেকেই ভরণপোষণ কার্যকর হবে।

    • ভরণপোষণের পরিমাণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে সামঞ্জস্যতা আনা।

গ) জাংকি বনাম রজনী (Janki vs. Rajni – 2024) (আদালতের সাম্প্রতিক দৃষ্টিভঙ্গি)

  • পর্যবেক্ষণ: সাম্প্রতিক রায়গুলিতে আদালত বারবার জোর দিয়েছে যে, ভরণপোষণের ক্ষেত্রে লিঙ্গ-নিরপেক্ষ (Gender-neutral) দৃষ্টিকোণ রাখতে হবে। যদি স্ত্রী যথেষ্ট পরিমাণে উপার্জনক্ষম হন এবং স্বামীর আয় কম হয় বা তিনি শারীরিক অক্ষমতার শিকার হন, তবে স্বামীও স্ত্রীর কাছ থেকে ভরণপোষণের দাবি করতে পারেন।

৪. উপসংহার

অ্যালিমনি কেবল একটি আর্থিক সহায়তা নয়, এটি ভারতীয় হিন্দু আইনে বিবাহবিচ্ছেদের কারণে আর্থিক অসমতার শিকার হওয়া দুর্বল পক্ষকে ন্যায়বিচার এবং আত্মমর্যাদার সাথে জীবনধারণের অধিকার নিশ্চিত করে। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের মাধ্যমে আইনি প্রক্রিয়া আরও সুসংগঠিত ও স্বচ্ছ হয়েছে, যা ভরণপোষণের পরিমাণ নির্ধারণে সামঞ্জস্যতা এনেছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button