“বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ”: ডিভোর্সের পর মুসলিম মহিলাকে ভুলভাবে বাতিল করা সোনা ও নগদ ফিরিয়ে দিল সুপ্রিম কোর্ট

ভুল রায়ে ক্ষতিগ্রস্ত এক মুসলিম মহিলা
বিবাহ-বিচ্ছেদের পর এক মুসলিম মহিলাকে তাঁর প্রাপ্য সোনার গয়না এবং নগদ টাকা দিতে অস্বীকার করেছিল কলকাতা হাইকোর্ট। হাইকোর্টের এই রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ওই মহিলা সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন এবং সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্টের রায় খারিজ করে ঐতিহাসিক রায় দিয়েছে।
সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, একজন মহিলার “বাস্তব জীবনযাত্রা” (Lived Realities) বিচার করার সময় তা অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে। কেবল কঠোর আইনগত ব্যাখ্যা প্রয়োগ করলে চলবে না।
সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ: ‘স্ত্রীধন’ এবং ‘গিফট’ আলাদা
বিচারপতি সঞ্জীব খান্না এবং বিচারপতি দীপাঙ্কর দত্তের ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়েছে যে, বিবাহিত মুসলিম মহিলার স্বামীর পরিবার থেকে প্রাপ্ত জিনিসগুলিকে শুধুমাত্র ‘গিফট’ (উপহার) হিসাবে দেখা উচিত নয়। এইগুলির মধ্যে অনেক জিনিসই ‘স্ত্রীধন’-এর সমতুল্য এবং বিবাহ-বিচ্ছেদের পর এগুলো মহিলার প্রাপ্য।
মামলাটিতে দেখা যায়, স্বামী ও তাঁর পরিবার সোনার গয়না এবং নগদ টাকা (যা বিয়ের সময় পাওয়া গিয়েছিল) বিবাহ-বিচ্ছেদের পর স্ত্রীকে ফিরিয়ে দিতে রাজি ছিল না। তারা যুক্তি দিয়েছিল যে, এইগুলি উপহার হিসাবে দেওয়া হয়েছিল, যা মুসলিম পার্সোনাল ল’ (শরিয়ত আইন)-এর অধীনে সরাসরি ‘স্ত্রীধন’ হিসেবে দাবি করা যায় না।
কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট জোর দিয়ে বলেছে যে, ঐতিহাসিকভাবে এই ধরনের জিনিসগুলি মহিলারই নিজস্ব সম্পত্তি এবং তাঁকে এগুলো থেকে বঞ্চিত করা যায় না। বেঞ্চ পর্যবেক্ষণ করে:
“আইনের কঠোর এবং বিচ্ছিন্ন ব্যাখ্যা দিয়ে নিম্ন আদালতের রায়কে বাতিল করা হলেও, একজন বিবাহিত মুসলিম মহিলার জীবনযাপন এবং পারিবারিক পটভূমি বিবেচনা করতে হবে। এসব জিনিস কেবল উপহার নয়, বরং তাঁর আর্থিক নিরাপত্তার অংশ।”
কলকাতা হাইকোর্টের ভুল কোথায় ছিল?
কলকাতা হাইকোর্ট তার রায়ে বলেছিল যে, ওই মহিলা তাঁর দাবির সমর্থনে কোনো “অকাট্য প্রমাণ” দেখাতে পারেননি যে ওই সামগ্রীগুলি তাঁর নিজস্ব ‘স্ত্রীধন’ ছিল। হাইকোর্ট স্বামীপক্ষের যুক্তি মেনে নেয় যে ওই গয়না এবং নগদ টাকা উপহার হিসেবে দেওয়া হয়েছিল, যা বিচ্ছেদের পর ফেরত দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়।
সুপ্রিম কোর্ট এই রায়ের ত্রুটি সংশোধন করে বলেছে যে, পারিবারিক বিবাদের ক্ষেত্রে প্রমাণ সংগ্রহের যে কঠিন শর্ত হাইকোর্ট আরোপ করেছে, তা বাস্তবসম্মত নয়। আদালত মনে করে, একটি বিবাহ-বিচ্ছেদ পরবর্তী পরিস্থিতিতে একজন মহিলার অধিকারকে এতটা কঠোরভাবে সংকুচিত করা উচিত নয়।
রায় এবং তাৎপর্য
সুপ্রিম কোর্ট ওই মহিলাকে ৪০০ গ্রাম সোনা এবং নগদ ₹১,০০,০০০ (এক লক্ষ টাকা) ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
এই রায়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি পারিবারিক বিবাদের ক্ষেত্রে শুধু কঠোর আইনি নথিপত্রের উপর নির্ভর না করে, বরং মহিলাদের ‘lived realities’ (বাস্তব জীবনযাপন) এবং আর্থিক নিরাপত্তার দিকটি বিচার করার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেয়। এই রায় মুসলিম মহিলাদের বিবাহ-বিচ্ছেদের পর তাদের প্রাপ্য সম্পত্তি পুনরুদ্ধারে এক গুরুত্বপূর্ণ নজির সৃষ্টি করল।



