ডিএ-প্রদানকারী স্কুলেও শিক্ষকতার সময় পেনশনের জন্য গণ্য হবে: যুগান্তকারী রায় কলকাতা হাইকোর্টের
রাজ্যের আপিল খারিজ, হাইকোর্ট জানাল – পুরনো চাকরি নিয়োগের জন্য বিবেচিত হলে পেনশনের যোগ্য সময় হিসেবেও গণ্য করতে হবে

শিক্ষক নিয়োগ ও পেনশন সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কলকাতা হাইকোর্ট রাজ্য সরকারের যুক্তি খারিজ করে এক যুগান্তকারী রায় দিয়েছে। আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, একজন শিক্ষক যদি পশ্চিমবঙ্গ সেন্ট্রাল স্কুল সার্ভিস কমিশন (WB-SSC)-এর মাধ্যমে পরবর্তী নিয়োগের সময় তাঁর আগের ডিএ-প্রদানকারী (Dearness Allowance-paying) স্কুলে কাজ করা সময়কে কাজে লাগাতে পারেন, তাহলে সেই সময়টিকেও অবশ্যই পেনশনের যোগ্য সময় (Qualifying Service) হিসেবে গণ্য করতে হবে।
মামলার প্রেক্ষাপট
এই মামলার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন একজন সহকারী শিক্ষক, যিনি ১৯৯৩ সালের ২৮ জুলাই একটি ডিএ-প্রদানকারী স্কুলে চাকরি শুরু করেন এবং সেই সময় সরকারি ডিএ পেতেন।
পরবর্তীতে তিনি WB-SSC-এর নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশ নেন এবং পূর্বের ওই ডিএ-প্রদানকারী স্কুলের কাজের অভিজ্ঞতাকে বিবেচনা করে একটি সরকারি-অনুদানপ্রাপ্ত (Government-aided) স্কুলে প্রধান শিক্ষক (Head Master) হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন।
২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর তিনি অবসর গ্রহণ করেন। সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন রাজ্য কর্তৃপক্ষ তাঁর প্রথম স্কুলে (ডিএ-প্রদানকারী স্কুল) কাটানো সময়কে পেনশনের যোগ্য সময় হিসেবে গণ্য করতে অস্বীকার করে। এর ফলে তিনি পূর্ণ পেনশন সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছিলেন।
রাজ্য সরকারের যুক্তি
রাজ্য সরকার হাইকোর্টের সিঙ্গল জজের রায়ের বিরুদ্ধে ডিভিশন বেঞ্চে আপিল করে। রাজ্যের প্রধান যুক্তি ছিল:
-
স্কিম প্রযোজ্য নয়: ১৯৮৫ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্বীকৃত অ-সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্মচারী (মৃত্যু-সহ-অবসর সুবিধা) প্রকল্প, ১৯৮৫ (West Bengal Recognised Non-Government Educational Institutions Employees Scheme, 1985) অনুযায়ী, ডিএ-প্রদানকারী স্কুলগুলির শিক্ষকরা পেনশন স্কিমের আওতায় আসেন না। তাই ওই সময়কাল পেনশন যোগ্য হবে না।
হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের চূড়ান্ত রায়
বিচারপতি পার্থ সারথি চ্যাটার্জি ও বিচারপতি তাপব্রত চক্রবর্তীর সমন্বয়ে গঠিত কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ রাজ্যের এই যুক্তি সম্পূর্ণরূপে খারিজ করে দেন।
আদালতের যুক্তি ছিল:
-
প্রশাসনিক স্বীকৃতি: যখন WB-SSC ওই শিক্ষককে সরকারি-অনুদানপ্রাপ্ত স্কুলে প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের জন্য তাঁর প্রথম স্কুলের অভিজ্ঞতাকে প্রশাসনিকভাবে গ্রহণ করেছে এবং কাজের সময়কে বিবেচনা করেছে, তখন রাজ্য সরকার এখন এই সময়টিকে পেনশনযোগ্য নয় বলে বাতিল করতে পারে না।
-
ন্যায়সঙ্গত পরিষেবা: আদালত উল্লেখ করেছে, যে কাজের সময়কে নিয়োগের জন্য যোগ্য হিসেবে ধরা হয়েছে, সেই সময়কেই পেনশনের যোগ্য ‘কোয়ালিফাইং সার্ভিস’ হিসেবে গণ্য করা উচিত। পেনশন স্কিম প্রযোজ্য না হওয়ার যুক্তি এই ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ শিক্ষক নিজেই সরকারের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে নিয়োগ পেয়েছিলেন।
অতএব, রাজ্যের আপিলটি নামঞ্জুর করা হয়েছে এবং সিঙ্গল জজের রায়ই বহাল রাখা হয়েছে। আদালত নির্দেশ দিয়েছে যে, ওই শিক্ষককে তাঁর পুরো কাজের সময়কাল (ডিএ স্কুল + এইডেড স্কুল) পেনশনের জন্য গণ্য করে দ্রুত সমস্ত অবসর সুবিধা প্রদান করতে হবে।
প্রভাব ও গুরুত্ব
এই রায়টি শুধুমাত্র ওই শিক্ষকের জন্য নয়, বরং রাজ্যের বহু শিক্ষক ও স্কুলকর্মীর জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নজির তৈরি করেছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে—
-
চাকরি পরিবর্তনের সময় বা স্কুলের ধরন বদলের সময় শিক্ষকদের পেনশন সুবিধা হারানোর আশঙ্কা দূর হলো।
-
এটি নিশ্চিত করে যে, সরকারি সুবিধা (যেমন এইডেড স্কুল নিয়োগ) পেতে যদি পুরনো অভিজ্ঞতা ব্যবহার করা হয়, তবে সেই অভিজ্ঞতার মূল্য অবশ্যই পেনশন সুবিধাতেও প্রতিফলিত হতে হবে।
-
শিক্ষা দপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এখন থেকে একই ধরনের পেনশন আবেদন বা রিট মামলায় এই যুক্তি ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।



