সুপ্রিমকোর্ট

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ভুয়ো মামলার শিকার অভিযুক্তের অব্যাহতি: জমি বিবাদ ও ফৌজদারি অভিযোগের দ্বন্দ

মামলার পটভূমি ও প্রেক্ষাপট

সাম্প্রতিক এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে সুপ্রিম কোর্ট অফ ইন্ডিয়া (Supreme Court of India) জমি সংক্রান্ত দেওয়ানি বিরোধের জেরে দায়ের হওয়া একটি ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্তকে অব্যাহতি (Discharge) দিয়েছে। এই মামলাটি দেশের বিচার ব্যবস্থার সামনে প্রশ্ন তুলে ধরেছে যে, কীভাবে দেওয়ানি বিবাদগুলিকে ফৌজদারি অভিযোগের মাধ্যমে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে।

মামলাটির সূত্রপাত হয় ২০২৯ সালের ১৯ মার্চ। সল্টলেকের সিএফ-২৩১, সেক্টর-১ ঠিকানার একটি সম্পত্তির সহ-মালিকানাকে কেন্দ্র করে দুই ভাই, শ্রী বিমলেন্দু বিশ্বাস এবং শ্রী অমলেন্দু বিশ্বাসের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে দেওয়ানি বিবাদ চলছিল। এই সম্পত্তিটি ছিল অভিযুক্ত তুহিন কুমার বিশ্বাস ওরফে বুম্বা-র পৈতৃক সম্পত্তি এবং তিনি বিমলেন্দু বিশ্বাসের পুত্র। বিবাদ চলাকালীন, ২০১৮ সালের ২৯ নভেম্বর, সংশ্লিষ্ট সিভিল জজ একটি অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা জারি করে উভয় পক্ষকে সম্পত্তিতে যৌথ দখল বজায় রাখার নির্দেশ দেন এবং তৃতীয় পক্ষের স্বার্থ সৃষ্টিতে বয়রাণ করেন।

এই নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই, অভিযোগকারী মমতা আগরওয়াল (Complainant Ms. Mamta Agarwal), যিনি নিজেকে অমলেন্দু বিশ্বাসের সম্ভাব্য ভাড়াটিয়া বলে দাবি করেছিলেন, তিনি সেই সম্পত্তিতে প্রবেশ করতে গেলে তুহিন কুমার বিশ্বাস @ বুম্বা তাঁকে বাধা দেন। অভিযোগকারী এরপর বিধাননগর উত্তর থানায় তুহিন কুমার বিশ্বাসের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির (IPC) ৩৪১ (অন্যায়ভাবে বাধা দেওয়া), ৩৫৪সি (Voyeurism বা গোপন মুহূর্তের ছবি তোলা/ভিডিও করা) এবং ৫০৬ (ফৌজদারি ভয় দেখানো) ধারায় একটি অভিযোগ বা এফআইআর (FIR) দায়ের করেন। অভিযোগে বলা হয়, অভিযুক্ত তাঁকে ভয় দেখিয়েছেন, প্রবেশে বাধা দিয়েছেন এবং তাঁর ছবি ও ভিডিও তুলে তাঁর ব্যক্তিগত পরিসরে হস্তক্ষেপ করে শালীনতার অবমাননা করেছেন।

মহিলার পূর্বের অপরাধের উল্লেখ ও অভিযুক্তের সওয়াল

তদন্ত শেষে পুলিশ অভিযুক্তের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করে। এরপর অভিযুক্ত তুহিন কুমার বিশ্বাস ট্রায়াল কোর্টে নিজেকে অব্যাহতি দেওয়ার (Discharge) আবেদন করেন। অভিযুক্তের পক্ষে তাঁর আইনজীবী সুপ্রিম কোর্টে জোরালো সওয়াল করে বলেন, এই এফআইআরটি অমলেন্দু বিশ্বাসের প্ররোচনায় দায়ের করা হয়েছে, যিনি দেওয়ানি আদালতের নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে সম্পত্তিতে তৃতীয় পক্ষের অধিকার সৃষ্টির চেষ্টা করছিলেন। অভিযুক্ত কেবল যৌথ দখল বজায় রাখার জন্যই প্রতিবাদ করেছিলেন।

কে এই মমতা আগরওয়াল? কি তার ইতিহাস? পড়ুন বিস্তারিত

গুরুত্বপূর্ণভাবে, অভিযুক্তের কৌঁসুলি আদালতকে জানান যে অভিযোগকারী মমতা আগরওয়াল একজন অভ্যাসগত অপরাধী (habitual offender)। তাঁর বিরুদ্ধে ইতোপূর্বে গুরুতর ফৌজদারি অভিযোগ রয়েছে, যার মধ্যে একটি মামলায় ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০২ (হত্যা) এবং ৩০৭ (হত্যার চেষ্টা)-এর মতো ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে এবং অন্য একটি মামলায় ৩২৩, ৩৪১, ৫০৬(II) সহ অন্যান্য ধারায় অভিযোগ রয়েছে। এই তথ্যটি অভিযোগের উদ্দেশ্য এবং বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এছাড়াও, চার্জশিটেও বলা হয়েছে যে অভিযোগকারী বিচার বিভাগীয় বিবৃতি (judicial statement under Section 164 Cr.P.C.) দিতে ইচ্ছুক ছিলেন না, যা মামলার দুর্বলতা আরও প্রকট করে।

ট্রায়াল কোর্ট এবং পরবর্তীকালে কলকাতা হাইকোর্ট অভিযুক্তের ডিসচার্জের আবেদন খারিজ করে দেয়। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেই তুহিন কুমার বিশ্বাস সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন।

আদালতের পর্যবেক্ষণ ও আইনি বিশ্লেষণ

সুপ্রিম কোর্ট মামলাটি বিবেচনা করার সময় ফৌজদারি কার্যবিধির (Cr.P.C.) ২২৭ ধারার অধীনে অভিযুক্তকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়ে প্রযোজ্য আইনি নীতিগুলি পুনর্ব্যক্ত করে। আদালত স্পষ্ট করে, বিচারককে শুধুমাত্র প্রমাণাদি চেলে দেখতে হবে যে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে মামলা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট ভিত্তি আছে কি না। যদি দুটি মত সমানভাবে সম্ভব হয় এবং প্রমাণ কেবল সন্দেহ সৃষ্টি করে (গুরুতর সন্দেহ বা ‘grave suspicion’ নয়), তবে অভিযুক্তকে অব্যাহতি দিতে হবে। আদালত কেবল প্রসিকিউশনের মুখপত্র হিসেবে কাজ করতে পারে না।

সুপ্রিম কোর্ট এফআইআর-এ দায়ের হওয়া অভিযোগের প্রতিটি ধারা বিশ্লেষণ করে:

১. ধারা ৩৫৪সি (Voyeurism): আদালত লক্ষ্য করে যে কলকাতা হাইকোর্ট নিজেই পর্যবেক্ষণ করেছিল যে অভিযোগগুলি এই ধারার অধীনে কোনো অপরাধ প্রকাশ করে না। ৩৫৪সি ধারায় অপরাধ সংঘটিত হওয়ার জন্য অভিযোগকারীর ‘ব্যক্তিগত কাজ’ (‘private act’) করার সময় অভিযুক্ত তাঁকে দেখেছে বা চিত্রবন্দী করেছে—এমন প্রমাণ থাকা আবশ্যক। বর্তমান মামলায় অভিযোগকারী সম্পত্তিতে প্রবেশের সময় ছবি তোলার অভিযোগ করেছিলেন, যা ৩৫৪সি ধারার সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে না।

২. ধারা ৫০৬ (ফৌজদারি ভয় দেখানো): আদালত পর্যবেক্ষণ করে যে এফআইআর এবং চার্জশিটে অভিযোগকারীকে কীভাবে তাঁর ব্যক্তি, খ্যাতি বা সম্পত্তির ক্ষতি করার হুমকি দেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে সম্পূর্ণ নীরব। অভিযুক্তের দ্বারা উচ্চারিত শব্দগুলিও উল্লেখ করা হয়নি। তাই, ফৌজদারি ভীতি প্রদর্শনের উপাদানগুলি এখানে অনুপস্থিত।

৩. ধারা ৩৪১ (অন্যায়ভাবে বাধা দেওয়া): অন্যায়ভাবে বাধা দেওয়ার অপরাধে একটি ব্যতিক্রম রয়েছে—যদি কেউ সদ্ভাবে (in good faith) বিশ্বাস করেন যে তাঁর বাধা দেওয়ার আইনি অধিকার রয়েছে, তবে এটি অপরাধ নয়। যেহেতু সম্পত্তিতে যৌথ দখল বজায় রাখার জন্য দেওয়ানি আদালতের নির্দেশ ছিল এবং অভিযুক্ত সেই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিচ্ছিলেন, তাই তিনি ‘সদ্ভাব’ ব্যতিক্রমের অধীনে থাকতে পারেন।

চূড়ান্ত নির্দেশ

সুপ্রিম কোর্ট দৃঢ়তার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করে যে, একটি দেওয়ানি বিরোধের প্রেক্ষাপটে যেখানে একটি অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর ছিল এবং অভিযোগকারী বিচার বিভাগীয় বিবৃতি দিতে অনিচ্ছুক ছিলেন, সেখানে আইনত গ্রহণযোগ্য উপাদানের ভিত্তিতে শক্তিশালী সন্দেহ অনুপস্থিত ছিল। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে মামলা চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ‘গুরুতর সন্দেহ’ সৃষ্টি করার মতো যথেষ্ট উপাদান চার্জশিটে নেই।

এই পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে, সুপ্রিম কোর্ট আপিলটি মঞ্জুর করে। হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত এবং নিম্ন আদালতের অব্যাহতি খারিজের আদেশ বাতিল করা হয়। ফলস্বরূপ, তুহিন কুমার বিশ্বাস @ বুম্বা-কে তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া G.R. Case No. 223 of 2020 (Bidhannagar North Police Station FIR No. 50 of 2020 থেকে উদ্ভূত) মামলা থেকে অব্যাহতি প্রদান করা হয়।

এই রায় প্রমাণ করে যে বিচার ব্যবস্থার উচিত দেওয়ানি বিবাদ এবং ব্যক্তিগত বিদ্বেষের জেরে ফৌজদারি প্রক্রিয়াকে অপব্যবহার করার প্রচেষ্টাকে কঠোর হাতে দমন করা।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button