খবরাখবর

অতীতের কলঙ্কিত ঘটনার চরিত্র ফের একবার প্রকাশ্যে, জানুন কোন মামলায়

কলকাতার স্কুলে গুলি: সম্পত্তি বিবাদের বলি দুই যুবক, প্রিন্সিপাল ও নিরাপত্তারক্ষী গ্রেফতার

ঘটনার পটভূমি ও প্রেক্ষাপট

২০১৩ সালের ১১ নভেম্বর কলকাতার শর্ট স্ট্রিটে (Short Street)-এর ৯এ ঠিকানায় অবস্থিত একটি নার্সারি স্কুলে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে, যা কলকাতার বুকে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। এই হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ ছিল সেই স্কুলের সম্পত্তি নিয়ে বহু বছরের পুরনো ও জটিল আইনি বিবাদ।

শর্ট স্ট্রিটের এই সম্পত্তিটি ১৯৪৬ সাল থেকে বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল। ১৯৯৯ সালে এটির মালিক শৈলবালা সেন সম্পত্তিটি মুম্বাইয়ের একটি পক্ষের কাছে বিক্রি করে দেন বলে অভিযোগ ওঠে। ২০০৩ সালে শৈলবালা সেনের মৃত্যুর পর জানা যায়, তিনি তাঁর দুই নাতনির নামে উইল করে গেছেন। সেই নাতনিরা পরে রতনলাল নাহার নামে একজনের কাছে সম্পত্তিটি বিক্রি করে দেন।

কিন্তু ২০১০ সালে সঞ্জয় সুরেশা নামে অন্য একজন দাবি করেন যে, তিনি মুম্বাইয়ের সেই পক্ষের কাছ থেকে সম্পত্তিটি কিনেছেন। এই দাবির পর রতনলাল নাহাটা এবং সঞ্জয় সুরেশার মধ্যে সম্পত্তি নিয়ে আইনি লড়াই শুরু হয়। পুলিশ সূত্র অনুযায়ী, রতনলাল নাহাটা মামলায় পরাজিত হন, কারণ শৈলবালা সেনের উইল-এর কোনো প্রোবেট (Probate) ছিল না। তবে মামলা হারার পরেও রতনলাল নাহাটা সম্পত্তি ছেড়ে যাননি।

মমতা আগরওয়ালের বিরুদ্ধে ফের একবার অভিযোগ

ঘটনার সময়, অভিযুক্ত মমতা আগরওয়াল (Mamata Agarwal) ওই নার্সারি স্কুলের প্রিন্সিপাল ছিলেন এবং একই সঙ্গে তিনি সেই বিতর্কিত সম্পত্তিতে থাকতেন। রতনলাল নাহাটাও তাঁর সঙ্গে থাকতেন।

হত্যাকাণ্ডের দিন এবং অভিযুক্তের দাবি

হত্যাকাণ্ডের দিন, অর্থাৎ ১১ নভেম্বর, ২০১৩-এর ভোর ৫টার দিকে, সঞ্জয় সুরেশার দ্বারা ভাড়া করা একটি সিকিউরিটি এজেন্সি ‘অ্যাকটিভ’-এর ১৮ জন কর্মী ওই সম্পত্তির দখল নিতে সেখানে চড়াও হন। এই অনুপ্রবেশকারীদের মধ্যে দুজন ছিলেন ২৬ ও ২৮ বছর বয়সী যুবক—যারা পরে নিহত হন।

মামলাটির প্রধান অভিযুক্ত, স্কুল প্রিন্সিপাল মমতা আগরওয়াল দাবি করেন যে, দুই ব্যক্তি তাঁর অফিসে প্রবেশ করে তাঁকে আক্রমণ করে, তাঁর পোশাক ছিঁড়ে ফেলে এবং শ্বাসরোধের চেষ্টা করে। আত্মরক্ষার্থেই তিনি গুলি চালান।

পুলিশি তদন্ত ও অভিযোগ

তবে মমতা আগরওয়ালের এই দাবি পুলিশের তদন্তে এবং সিসিটিভি ফুটেজে মিথ্যা প্রমাণিত হয়।

  • সিসিটিভি ফুটেজের তথ্য: পুলিশি সূত্র অনুযায়ী, সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায় যে প্রিন্সিপালের রুমে দুজন অনুপ্রবেশ করে তাঁকে আক্রমণ করছে, এমন কোনো দৃশ্য সেখানে নেই। বরং, ফুটেজে দেখা যায় একজন মহিলা নিরাপত্তারক্ষী মমতা আগরওয়ালের রুমের দিকে হেঁটে যাচ্ছেন এবং রুমের ভেতর থেকে গুলি চালানো হচ্ছে।

  • গুলি চালানোর ঘটনা: কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের যুগ্ম কমিশনার পল্লব কান্তি ঘোষ জানান, সম্ভবত ভেতর থেকে গুলি চালানো হয়েছিল এবং ঘটনাস্থলেই দুজন মারা যান ও একজন আহত হন।

  • অস্ত্রের ব্যবহার: পুলিশ জানায়, মোট সাত রাউন্ড গুলি চালানো হয়েছিল—দুটি .৩০৩ রাইফেল থেকে এবং পাঁচটি সিঙ্গেল ব্যারেল বন্দুক থেকে। প্রিন্সিপাল মমতা আগরওয়াল এবং তাঁর নিরাপত্তারক্ষী পাপ্পু খান (Pappu Khan) দাবি করেন যে এই অস্ত্রগুলি রতনলাল নাহার লাইসেন্সপ্রাপ্ত অস্ত্র ছিল। ঘটনাস্থল থেকে ২০টি জীবন্ত কার্তুজও উদ্ধার করা হয়।

  • নিহতদের অস্ত্র: পুলিশ জানায়, অনুপ্রবেশকারীরা শুধুমাত্র লাঠি নিয়ে প্রবেশ করেছিল। অন্য কোনো অস্ত্র তাদের কাছে ছিল না। অন্যদিকে, মমতা আগরওয়াল এবং পাপ্পু খান, এই দুজনের কাছেই বন্দুক ছিল।

গুলি চালানোর পর অনুপ্রবেশকারীরা পালিয়ে গেলেও কয়েকজন কর্মী সম্পত্তির অভ্যন্তরে একটি রুমে লুকিয়ে পড়েন। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, মমতা আগরওয়াল এবং তাঁর নিরাপত্তারক্ষী পাপ্পু খান বেশ কয়েকবার বন্দুক হাতে সেই রুমের দিকে যাচ্ছেন। পরে সেই রুমেই নিহতদের মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া যায়।

কার বিরুদ্ধে কীসের অভিযোগ

এই জোড়া খুনের ঘটনায় নার্সারি স্কুলের প্রিন্সিপাল মমতা আগরওয়াল এবং তাঁর নিরাপত্তারক্ষী পাপ্পু খান-কে গ্রেফতার করা হয়।

  • অভিযোগ: তাদের বিরুদ্ধে মূলত খুনের (Murder) অভিযোগ আনা হয়। পুলিশি তদন্তে এটি স্পষ্ট হয় যে সম্পত্তির দখল নিয়ে দীর্ঘদিনের বিবাদের জেরেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল এবং প্রিন্সিপালের আত্মরক্ষার দাবিটি মিথ্যা ছিল।

নিহত যুবকদের পরিবারের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়। তাদের বক্তব্য, যুবকেরা কেবল তাদের চাকরি করছিল, তবে ভোর ৫টায় চাকরি করতে যাওয়ার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল।

এই ঘটনাটি কলকাতার বুদ্ধিজীবী মহলে গভীর ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল এবং সম্পত্তি বিবাদের জেরে দুজন যুবকের নির্মম মৃত্যু গোটা শহরকে নাড়িয়ে দিয়েছিল।

এই মামলায় মমতার জামিন

স্বাস্থ্যগত কারণে জামিন পেলেন মমতা আগরওয়াল: শর্ট স্ট্রিট হত্যা মামলা

২০১৪ সালের মার্চ মাসে, কলকাতা হাইকোর্ট শর্ট স্ট্রিটের ৯এ ঠিকানায় সংঘটিত জোড়া হত্যা মামলার মূল অভিযুক্ত মমতা আগরওয়ালকে স্বাস্থ্যগত কারণে জামিন মঞ্জুর করে। হাইকোর্টের বিচারপতি শুভ্র কমল মুখার্জি এবং বিচারপতি শিব সাধন সাধুর ডিভিশন বেঞ্চ এই রায় দেয়।

জামিনের কারণ:

  • গুরুতর অসুস্থতা: আদালত বিবেচনা করে যে অভিযুক্ত মমতা আগরওয়াল মারাত্মক অসুস্থ (critically unwell) এবং এই কারণে তিনি আলিপুর মহিলা জেল থেকে বাইপাসের অ্যাপোলো গ্লেনেগলস হাসপাতালে স্থানান্তরিত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। তিনি মূলত রেসপিরেটরি ট্র্যাক্ট (শ্বাসতন্ত্র) এবং ইউরিনারি ট্র্যাক্ট (মূত্রনালী)-এর সংক্রমণে ভুগছিলেন।

  • কারাবাসের সময়কাল: আদালত আরও পর্যবেক্ষণ করে যে, অভিযুক্ত জামিনের আবেদনের সময় ১২৭ দিন ধরে জেল হেফাজতে ছিলেন।

  • অতিরিক্ত আটক রাখার প্রয়োজনীয়তা নেই: বিচারকরা রায় দেন, “কেস ডায়েরি এবং নথিপত্র বিবেচনা করে… এবং অভিযুক্ত একজন মহিলা, যিনি গুরুতর অসুস্থ ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, এবং ১২৭ দিন ধরে হেফাজতে থাকার বিষয়টি বিবেচনা করে, আমরা মনে করি না যে তাঁকে আর আটক রাখার কোনো প্রয়োজন আছে।”

জামিনের শর্ত:

যদিও অভিযোগকারী পক্ষ (পাবলিক প্রসিকিউটর) ‘অবাধ ও সুষ্ঠু তদন্ত’-এর স্বার্থে জামিনের বিরোধিতা করেছিলেন, কিন্তু চার্জশিট দাখিল হয়ে যাওয়ার পর তদন্ত শেষ হওয়ার যুক্তি দেখিয়ে আদালত জামিন মঞ্জুর করে। তবে আদালত কঠোর শর্ত আরোপ করে:

১. মমতা আগরওয়ালকে শেক্সপিয়ার সরণি (Shakespeare Sarani) এবং পার্ক স্ট্রিট (Park Street) থানার এখতিয়ারভুক্ত এলাকায় প্রবেশ করতে বারণ করা হয়, যেহেতু শর্ট স্ট্রিটের ঘটনাস্থলটি শেক্সপিয়ার সরণি থানার অধীন।

২. তাঁকে অবশ্যই আদালতে তাঁর পাসপোর্ট জমা দিতে হবে।

৩. ১০,০০০ টাকার জামিন বন্ড (Bail Bond) জমা দিতে হবে।

এই মামলায় মমতা আগরওয়ালই প্রথম অভিযুক্ত, যিনি জামিন লাভ করেন। পুলিশের মতে, তাঁর গুরুতর শারীরিক অবস্থা তাঁর পক্ষে সিদ্ধান্ত নিতে সহায়ক হয়েছিল।

শর্ট স্ট্রিট হত্যা মামলা: নিরাপত্তারক্ষী প্রমোদ সউ-এর জামিন মঞ্জুর

২০১৪ সালের এপ্রিল মাসে কলকাতা হাইকোর্ট শর্ট স্ট্রিটের ৯এ ঠিকানায় জোড়া হত্যা মামলার অভিযুক্তদের মধ্যে অন্যতম নিরাপত্তারক্ষী প্রমোদ সউ-এর জামিন মঞ্জুর করে। প্রমোদ সউ ওই ঘটনায় প্রিন্সিপাল মমতা আগরওয়াল এবং অপর নিরাপত্তারক্ষী শাফিক আহমেদ ওরফে পাপ্পু খানের সঙ্গে গ্রেফতার হয়েছিলেন।

জামিনের মূল কারণ ছিল সিসিটিভি ফুটেজ:

  • প্রমোদ সউ-এর আইনজীবীর যুক্তি ছিল যে, তাঁর মক্কেলকে গুলি চালানোর অভিযোগে গ্রেফতার করা হলেও, ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজে স্পষ্ট দেখা গেছে যে মমতা আগরওয়াল নিজেই বাউন্সারদের লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছিলেন।

  • আইনজীবী ফিরোজ ইদুলজি আদালতে বলেন, “সউ-কে গুলি চালানোর অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছিল। কিন্তু ভিডিও ফুটেজে প্রমাণিত হয়েছে যে মমতা আগরওয়াল গুলি চালিয়েছিলেন, যা দুই ব্যক্তির মৃত্যু ঘটায়।”

এই জোরালো যুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি শুভ্র কমল মুখার্জি এবং বিচারপতি শিব সাধন সাধুর ডিভিশন বেঞ্চ জনস্বার্থ মামলার সরকারি কৌঁসুলি মঞ্জিত সিং-এর বিরোধিতা সত্ত্বেও প্রমোদ সউ-কে জামিন দেন।

তদন্তকারী অফিসাররা জানান, যদিও প্রমোদ সউ এবং পাপ্পু খান দুজনেই মমতা আগরওয়ালের বিশ্বস্ত সঙ্গী ছিলেন, কিন্তু গুলি কে চালিয়েছিল তা নিয়ে inicialmente কিছুটা বিভ্রান্তি ছিল, কারণ সিসিটিভি ফুটেজে অস্ত্র হাতবদল হতে দেখা যায়। তবে ব্যালিস্টিক রিপোর্টে নিশ্চিত হওয়া যায় কে মারাত্মক গুলিটি চালিয়েছিল।

এই মামলার প্রধান অভিযুক্ত মমতা আগরওয়াল ইতিমধ্যে ২০১৪ সালের ১৮ মার্চ স্বাস্থ্যগত কারণে জামিন পেয়েছিলেন। তবে অন্য অভিযুক্ত শাফিক আহমেদ ওরফে পাপ্পু খানের জামিনের আবেদন হাইকোর্টে সেই সময়েও বিচারাধীন ছিল।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button