হাইকোর্ট

আর্য সমাজ বিবাহ: শুধু শংসাপত্রই যথেষ্ট নয়, ‘সপ্তপদী’ সম্পন্ন করার প্রমাণ আবশ্যক – মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট

মামলার প্রেক্ষাপট

এই মামলাটি একটি জটিল পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে দায়ের করা হয়েছিল। মামলার মূল বাদী ছিলেন একজন অবসরপ্রাপ্ত কোম্পানি কমান্ডারের আইনি উত্তরাধিকারী (পুত্র), যার নাম অশ্বিনী কুমার শর্মা (Brahmswaroop Sharma-এর উত্তরাধিকারী)। মূল বাদী তাঁর বিরুদ্ধে বিবাহিত বলে দাবি করা শ্রীমতি কিরণ শর্মা-কে (Smt Kiran Sharma) আইনত স্ত্রী হিসেবে অস্বীকার করে আদালতে আবেদন করেছিলেন।

  • বাদীর অভিযোগ: মূল বাদী (অর্থাৎ অশ্বিনী কুমারের বাবা) অভিযোগ করেন যে তাঁর স্ত্রীর মৃত্যুর পর, কিরণ শর্মা তাঁর একাকীত্বের সুযোগ নিয়ে মিথ্যা বিবাহ সাজিয়েছেন এবং একটি “নকল ও জাল” আর্য সমাজ বিবাহের শংসাপত্র তৈরি করেছেন। তিনি আরও দাবি করেন যে কিরণ শর্মার অন্য একজনের সাথে পূর্ব-বিবাহ বিদ্যমান ছিল, যা তাঁর সাথে কিরণ শর্মার যেকোনো বিবাহের দাবিকে অবৈধ করে তোলে।

  • বিবাদীর বক্তব্য: জবাবে, শ্রীমতি কিরণ শর্মা দাবি করেন যে তিনি আর্য সমাজের আচার-অনুষ্ঠান মেনেই আইনত বিবাহ করেছেন, যার মধ্যে সপ্তপদী-এর মতো অপরিহার্য অনুষ্ঠানও সম্পন্ন হয়েছিল। তিনি আর্য সমাজ বিবাহের শংসাপত্র, পৌরসভা নিবন্ধনের রেকর্ড, ছবি এবং সাক্ষীদের জবানবন্দির ওপর নির্ভর করেছিলেন।

  • পারিবারিক আদালতের রায়: ফ্যামিলি কোর্ট কিরণ শর্মার বক্তব্যকে গ্রহণ করে এবং বাদীর মামলা খারিজ করে দেয়। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেই অশ্বিনী কুমার শর্মা মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন।

মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও রায়

বিচারপতি আনন্দ পাঠক (Justice Anand Pathak) এবং বিচারপতি হৃদেশ (Justice Hirdesh)-এর ডিভিশন বেঞ্চ এই আপিলটি বিবেচনা করে হিন্দু বিবাহ আইনের (Hindu Marriage Act, 1955) ৭ ধারার অধীনে বিবাহের বৈধতা যাচাইয়ের ওপর জোর দেয়।

১. বিবাহের বৈধতার প্রমাণ (সপ্তপদী): হাইকোর্ট স্পষ্ট করে যে, হিন্দু বিবাহ আইন অনুসারে, একটি হিন্দু বিবাহ তখনই বৈধ বলে বিবেচিত হয় যখন তা প্রথাগত আচার-অনুষ্ঠান মেনে “অনুষ্ঠিত” হয়। যদি সপ্তপদী (পবিত্র আগুনের চারপাশে সাতটি পদক্ষেপ) একটি কাস্টমারি অনুষ্ঠান হয়, তবে সপ্তম পদক্ষেপ সম্পন্ন হওয়ার পরই বিবাহ সম্পূর্ণ হয়।

২. আর্য সমাজ শংসাপত্রের ভূমিকা: আদালত রায় দেয় যে আর্য সমাজ মন্দির কর্তৃক প্রদত্ত বিবাহের শংসাপত্র নিজেই একটি বৈধ হিন্দু বিবাহের চূড়ান্ত প্রমাণ হতে পারে না, যতক্ষণ না সপ্তপদী-এর মতো অপরিহার্য অনুষ্ঠানগুলি যথাযথ প্রমাণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করা হয়।

৩. সুপ্রিম কোর্টের নজির: হাইকোর্ট তার পর্যবেক্ষণে সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক রায় ডলি রানি বনাম মণীশ কুমার চাঞ্চল্য (Dolly Rani v. Manish Kumar Chanchal, 2025) মামলার উল্লেখ করে। এই রায় অনুসারে, শুধুমাত্র নথিপত্র বা শংসাপত্র নয়, বরং বাধ্যতামূলক আচার-অনুষ্ঠানগুলি বাস্তবে সম্পন্ন হয়েছে কি না—এটাই একটি বৈধ হিন্দু বিবাহের আসল পরীক্ষা।

৪. প্রমাণের অভাব: এই মামলায় আদালত পর্যবেক্ষণ করে:

  • আর্য সমাজের সাক্ষীরা কেউই সপ্তপদী সম্পন্ন হওয়ার বিষয়ে কোনো বক্তব্য দেননি।

  • ছবিগুলিতে পবিত্র অগ্নি বা সাত পাক ঘোরার কোনো প্রমাণ ছিল না।

  • বিবাদী (কিরণ শর্মা) সপ্তপদী বা হিন্দু বিবাহ আইনের ৭ ধারা মেনে চলার প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হয়েছেন।

৫. বিবাহ একটি সংস্কার: আদালত মন্তব্য করে, “বিবাহ শুধু গান-বাজনা বা খানাপিনার অনুষ্ঠান নয়। হিন্দু বিবাহ বৈদিক পদ্ধতি অনুসারে সম্পন্ন হয়।”

রায়:

উপসংহারে, মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট ফ্যামিলি কোর্টের পূর্বের রায় বাতিল করে দেয়। আদালত রায় দেয় যে শুধু আর্য সমাজ বিবাহের শংসাপত্র এবং পৌরসভা নিবন্ধনই যথেষ্ট নয়। অপরিহার্য আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন হওয়ার কোনো প্রমাণ না থাকায়, শ্রীমতি কিরণ শর্মা মূল বাদীর আইনত স্ত্রী নন। আদালত কিরণ শর্মার বিরুদ্ধে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি করে, যাতে তিনি বাদীর ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ বা বৈবাহিক অধিকার দাবি করতে না পারেন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button