হাইকোর্ট

‘পর্যাপ্ত উপার্জনকারী কর্মজীবী স্ত্রী অন্তরবর্তীকালীন খোরপোশের অধিকারী নন’ – এক যুগান্তকারী রায়ে জানালো বম্বে হাইকোর্ট

বম্বে হাইকোর্ট (Bombay High Court) সম্প্রতি হিন্দু বিবাহ আইন, ১৯৫৫-এর ধারা ২৪ (Section 24 of the Hindu Marriage Act, 1955) সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলায় রায় দিয়েছে যে, যদি কোনো কর্মজীবী ​​স্ত্রীর (Working Wife) নিজেকে ভরণপোষণ করার জন্য পর্যাপ্ত উপার্জনের সংস্থান থাকে, তাহলে তিনি তাঁর স্বামীর কাছ থেকে অন্তরবর্তীকালীন খোরপোশ বা ‘মেন্টেন্যান্স প্যান্ডেটে লাইট’ (Maintenance Pendente Lite) পাওয়ার অধিকারী হবেন না।

বিচারপতি ও মামলার পরিচিতি বিচারপতি মঞ্জুষা দেশপান্ডে (Justice Manjusha Deshpande)-এর একক বেঞ্চ এই রায় প্রদান করেন।

  • মামলার টাইটেল (Case Title): দীপ্তি মোহন দাস বনাম অবিনাশ কৃষ্ণমূর্তি (Deepti Mohan Das v. Avinash Krishnamurthy)

  • রায় প্রকাশের তারিখ (Date of Judgment): ৯ ডিসেম্বর, ২০২৫।

  • বাদী (Wife): দীপ্তি মোহন দাস।

  • বিবাদী (Husband): অবিনাশ কৃষ্ণমূর্তি।

মামলার প্রেক্ষাপট স্ত্রী দীপ্তি মোহন দাস তাঁর স্বামী অবিনাশ কৃষ্ণমূর্তির বিরুদ্ধে নিষ্ঠুরতার অভিযোগে বিবাহবিচ্ছেদের মামলা দায়ের করেন এবং ধারা ২৪-এর অধীনে নিজের ও সন্তানের জন্য মাসিক ২৫,০০০ টাকা করে খোরপোশ দাবি করেন। ফ্যামিলি কোর্ট (Family Court) তাঁর খোরপোশের আবেদন খারিজ করে দেয়, তবে নাবালিকা মেয়ের জন্য প্রতি মাসে ১৫,০০০ টাকা খোরপোশ মঞ্জুর করে, যা আদেশের তারিখ থেকে কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। এই আদেশের বিরুদ্ধে স্ত্রী হাইকোর্টে রিট পিটিশন (Writ Petition) দাখিল করেন।

হাইকোর্টের মূল পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্ত হাইকোর্ট আবেদনকারী স্ত্রীকে খোরপোশ না দেওয়ার ফ্যামিলি কোর্টের সিদ্ধান্তকে বহাল রাখে। বিচারপতি দেশপান্ডে জোর দিয়ে বলেন যে, ধারা ২৪ অনুযায়ী অন্তরবর্তীকালীন খোরপোশ মঞ্জুর করার জন্য দুটি শর্ত পূরণ হওয়া আবশ্যিক: ১. আবেদনকারীর নিজের ভরণপোষণ করার জন্য পর্যাপ্ত সংস্থান (Sufficient Means) নেই—এই প্রমাণ দিতে হবে। ২. বিবাদী স্বামীর আবেদনকারীকে সহায়তা করার জন্য পর্যাপ্ত আয় রয়েছে।

আদালত লক্ষ্য করে যে, আবেদনকারী স্ত্রী একটি স্বনামধন্য ব্যাঙ্কে ‘ডেপুটি ম্যানেজার’ পদে কর্মরত। তাঁর জমা দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, তাঁর মাসিক বেতন ২৮,০৩২ টাকা। এছাড়া, তাঁর ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্ট এবং ডিম্যাট অ্যাকাউন্টের নথি পর্যালোচনা করে আদালত দেখে যে, ট্রেডিং, মিউচুয়াল ফান্ড এবং ডিভিডেন্ড থেকেও তাঁর অতিরিক্ত আয়ের উৎস রয়েছে। এমনকি, অতীতে ২০১৮ সালে একই সংস্থা থেকে তাঁর মাসিক বেতন ৬১,৫৯৬ টাকা ছিল।

আদালত এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, স্ত্রী নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা, নিশ্চিত চাকরি এবং একাধিক আয়ের উৎসের কারণে নিজেকে ভরণপোষণ করতে সম্পূর্ণ সক্ষম। তাই তিনি ‘পর্যাপ্ত সংস্থান নেই’– এই প্রাথমিক শর্তটি প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। আদালত আরও জানায়, আর্থিকভাবে স্বাধীন এবং লাভজনকভাবে নিযুক্ত স্ত্রীর জন্য বাসস্থান বা মামলার খরচও দাবি করা স্বাভাবিক অধিকার হতে পারে না।

সন্তানের খোরপোশের তারিখ পরিবর্তন সন্তানের খোরপোশের বিষয়ে, হাইকোর্ট ফ্যামিলি কোর্টের মঞ্জুর করা মাসিক ১৫,০০০ টাকার পরিমাণকে সঠিক বলে মনে করে। তবে, আদালত সুপ্রিম কোর্টের ‘রজনীশ বনাম নেহা’ (Rajnesh v. Neha) মামলার রায়ের উপর নির্ভর করে আদেশ দেয় যে, সন্তানের খোরপোশ আদেশের তারিখ থেকে নয়, বরং আবেদনের তারিখ থেকে কার্যকর হবে। বিলম্বের কারণে যাতে শিশু ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেই নীতি বজায় রেখে হাইকোর্ট এই পরিবর্তন আনে।

এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে হাইকোর্ট স্পষ্ট করে দেয় যে, অন্তরবর্তীকালীন খোরপোশ কোনো স্বয়ংক্রিয় অধিকার নয়, এটি কেবলমাত্র সেই ব্যক্তিকে দেওয়া হয় যিনি সত্যিই নিজেকে সাহায্য করতে অক্ষম।

মামলার রায়
deepti-mohan-das-v-avinash-krishnamurthy-2101671

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button