আটকে থাকা সুপারনোভা প্রকল্প শেষ করতে সুপ্রিম কোর্টের বিশেষ উদ্যোগ: সংবিধানের ১৪২ ধারা প্রয়োগ করে কমিটি গঠন

নয়ডার বহুল আলোচিত ‘সুপারটেক সুপারনোভা’ (Supertech Supernova) প্রকল্পের হাজার হাজার ঘর-ক্রেতাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটাতে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিয়েছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে ঝুলে থাকা এই আবাসন প্রকল্পটি সম্পন্ন করতে আদালত সংবিধানের ১৪২ নম্বর অনুচ্ছেদে প্রদত্ত বিশেষ ক্ষমতা (Article 142) ব্যবহার করেছে। এর ফলে প্রচলিত দেউলিয়া আইনের (Insolvency Law) জটিলতা এড়িয়ে সরাসরি আদালতের তত্ত্বাবধানে প্রকল্পটি শেষ করার পথ প্রশস্ত হলো।
ঘটনার পটভূমি ও জটিলতা
নয়ডার সেক্টর-৯৪ এলাকায় অবস্থিত ‘সুপারনোভা’ প্রকল্পটি একটি বিশাল মিশ্র উন্নয়ন প্রকল্প, যাতে আবাসিক অ্যাপার্টমেন্টের পাশাপাশি অফিস, স্টুডিও এবং বাণিজ্যিক ইউনিট রয়েছে। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে নির্মাতা সংস্থা ‘সুপারটেক রিয়েলটরস’ দেউলিয়া ঘোষিত হওয়ায় কাজ মাঝপথে থমকে যায়। প্রচলিত ‘ইনসলভেন্সি অ্যান্ড ব্যাঙ্করাপ্সি কোড’ (IBC) অনুযায়ী সমাধান আসতে দেরি হওয়ায় ঘর-ক্রেতাদের মধ্যে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। এই অচলাবস্থা কাটাতেই সুপ্রিম কোর্ট হস্তক্ষেপ করে।
আর্টিকেল ১৪২ এবং সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা
ভারতের সংবিধানের ১৪২ নম্বর অনুচ্ছেদ সুপ্রিম কোর্টকে ‘সম্পূর্ণ ন্যায়বিচার’ (Complete Justice) নিশ্চিত করার জন্য অসাধারণ ক্ষমতা প্রদান করে। যখন বিদ্যমান কোনো আইন কোনো জটিল সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান দিতে পারে না, তখন আদালত এই ক্ষমতা প্রয়োগ করে বিশেষ নির্দেশ দিতে পারে। এই মামলায় আদালত মনে করেছে, ঘর-ক্রেতাদের স্বার্থ রক্ষায় প্রচলিত আইনি কাঠামোর বাইরে গিয়ে একটি সমাধানমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
আদালত-নিয়ন্ত্রিত বিশেষ কমিটি গঠন
প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য সুপ্রিম কোর্ট তিন সদস্যের একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করেছে। এই কমিটির সদস্যরা হলেন: ১. বিচারপতি এম. কুমার: জম্মু ও কাশ্মীর হাইকোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি এবং NCLT-এর প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট। ২. ড. অনুপ কুমার মিত্তল: প্রকল্প ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ। ৩. রাজীব মেহত্রা: অর্থ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ।
এই কমিটি এখন থেকে সুপারটেকের আইআরপি (IRP) এবং পুরনো বোর্ড অফ ডিরেক্টর্সের বদলে প্রকল্পের সর্বেসর্বা হিসেবে কাজ করবে। নতুন ডেভেলপার নিয়োগ থেকে শুরু করে নির্মাণকাজের তদারকি—সবই করবে এই কমিটি।
ক্রেতাদের স্বার্থ রক্ষায় গৃহীত পদক্ষেপ
সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ক্রেতাদের স্বার্থে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে:
-
এস্ক্রো অ্যাকাউন্ট: প্রকল্পের যাবতীয় অর্থ একটি নির্দিষ্ট এস্ক্রো অ্যাকাউন্টে থাকবে এবং তা শুধুমাত্র নির্মাণের কাজেই ব্যবহৃত হবে।
-
নতুন ডেভেলপার: স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নতুন বিল্ডার নিয়োগ করা হবে, যেখানে পুরনো কোনো অসাধু সংস্থার যোগসূত্র থাকবে না।
-
কর্তৃপক্ষের প্রতি নির্দেশ: নয়ডা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন তারা বকেয়া পাওনার দাবিতে প্রকল্পের ছাড়পত্র আটকে না রাখে। আগে কাজ শেষ হবে, ঘর ক্রেতারা দখল পাবেন, তারপর বকেয়া মেটানো হবে।
-
ফরেনসিক অডিট: আগের আর্থিক লেনদেনে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে ফরেনসিক অডিটের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
উপসংহার
সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের ফলে এটি পরিষ্কার যে, আবাসন খাতে যখন সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ ঝুঁকির মুখে পড়ে, তখন আদালত তার সাংবিধানিক ক্ষমতা ব্যবহার করে রক্ষকের ভূমিকা পালন করতে পারে। এটি দেশের রিয়েল এস্টেট খাতের অন্যান্য আটকে থাকা প্রকল্পের ক্ষেত্রেও একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।



