খবরাখবর

ব্যক্তিগত সম্মান ও ‘ভুলে যাওয়ার অধিকার’ প্রেসের স্বাধীনতার চেয়েও বড়: দিল্লি হাইকোর্ট

ডিজিটাল যুগে মানুষের ব্যক্তিগত সম্মান ও সামাজিক মর্যাদা রক্ষায় এক যুগান্তকারী রায় দিল দিল্লি হাইকোর্ট। আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী একজন ব্যক্তির মর্যাদা ও সুনাম রক্ষা করার মৌলিক অধিকার, সংবাদমাধ্যমের মত প্রকাশের স্বাধীনতার (১৯ নম্বর অনুচ্ছেদ) চেয়েও বেশি অগ্রাধিকার পেতে পারে। বিশেষ করে যখন কোনো পুরনো সংবাদ বা তথ্য কারো বর্তমান জীবনে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

মামলার নেপথ্য কাহিনী

ঘটনাটি ২০২৩ সালের। একজন অভিজ্ঞ ব্যাংকারকে অর্থ পাচার (মানি লন্ডারিং) মামলায় এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED) গ্রেপ্তার করেছিল। সেই সময় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তার নাম ও গ্রেপ্তারের খবর ফলাও করে প্রচার করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে ট্রায়াল কোর্ট ওই ব্যক্তিকে সমস্ত অভিযোগ থেকে মুক্তি দেয় (Discharge) এবং জানায় যে তার বিরুদ্ধে কোনো অপরাধ প্রমাণিত হয়নি।

সমস্যা তৈরি হয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নিয়ে। অভিযোগ থেকে মুক্তি পেলেও, সার্চ ইঞ্জিন ও অনলাইন পোর্টালগুলোতে তার গ্রেপ্তার সংক্রান্ত খবরগুলো রয়ে যায়। ফলে ১৭ বছরের কর্মজীবনে অর্জিত তার স্বচ্ছ ভাবমূর্তি ও সামাজিক সম্মান প্রতিনিয়ত ক্ষুণ্ন হচ্ছিল। নিজের সুনাম ফিরে পেতে তিনি আদালতের দ্বারস্থ হন এবং ‘রাইট টু বি ফরগটেন’ বা ‘বিস্মৃত হওয়ার অধিকার’ দাবি করেন।

দিল্লি হাইকোর্টের ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ

বিচারপতি চন্দ্রশেখরন সুধা এই মামলার রায়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেন:

  • মর্যাদার অগ্রাধিকার: আদালত বলেছে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অবশ্যই গণতন্ত্রের স্তম্ভ, কিন্তু তা অসীম নয়। যখন কোনো সংবাদ বা নিবন্ধ অনলাইনে বছরের পর বছর থেকে যায় এবং একজন নির্দোষ ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে থাকে, তখন ব্যক্তির সম্মানের অধিকারই বেশি প্রাধান্য পাবে।

  • অতীত বনাম বর্তমান: আদালত পর্যবেক্ষণ করেছে যে, পুরনো অপরাধের রেকর্ড বা ভুল অভিযোগের ডিজিটাল উপস্থিতি একজন ব্যক্তির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারকে ধ্বংস করে দিতে পারে। বিশেষ করে যখন আদালত তাকে নির্দোষ ঘোষণা করেছে, তখন সেই পুরনো খবর অনলাইনে থাকা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।

  • সংবাদমাধ্যমের প্রতি বার্তা: আদালত জানিয়েছে, প্রেসের স্বাধীনতা থাকলেও ডিজিটাল যুগে কোনো খবর অবিরত অনলাইনে রাখার ক্ষেত্রে সংযমী হওয়া প্রয়োজন। ব্যক্তির ব্যক্তিগত অধিকার ও মর্যাদাকে কোনোভাবেই খাটো করা যাবে না।

আদালতের সিদ্ধান্ত ও প্রভাব

প্রাথমিকভাবে একটি ট্রায়াল কোর্ট নির্দিষ্ট কিছু সংবাদ ডি-ইন্ডেক্স (সার্চ ইঞ্জিন থেকে সরিয়ে ফেলা) করার নির্দেশ দিয়েছিল। সংবাদ প্রকাশনা সংস্থা ‘আইই অনলাইন মিডিয়া সার্ভিসেস’ এই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে আপিল করলেও, আদালত তা খারিজ করে দেয়।

এই রায়ের ফলে ভারতে ‘রাইট টু বি ফরগটেন’ (Right to be Forgotten) বা ডিজিটাল জগত থেকে নিজের অতীত মুছে ফেলার অধিকার আরও শক্তিশালী হলো। আদালত স্পষ্ট করে দিল যে, অপরাধী সাব্যস্ত না হওয়া ব্যক্তির সম্মান রক্ষা করা রাষ্ট্রের ও আইনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button