
বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির সাথে সাথে বিচারব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI)-এর ব্যবহার একটি চর্চিত বিষয়। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টে বিচার বিভাগে এআই এবং মেশিন লার্নিং (ML) নিয়ন্ত্রণের দাবিতে একটি জনস্বার্থ মামলা (PIL) দায়ের করা হয়েছিল। ৫ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত এই মামলাটি খারিজ করে দিলেও প্রযুক্তি ব্যবহারের ঝুঁকি ও সম্ভাবনা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ পেশ করেছে।
মামলার প্রেক্ষাপট ও বিচারপতিদের মন্তব্য
‘কার্তিকেয় রাওয়াল বনাম ভারত সরকার’ (Kartikeya Rawal vs Union of India) শীর্ষক এই জনস্বার্থ মামলার শুনানি হয় ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত (CJI Surya Kant) এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী (Justice Joymalya Bagchi)-র সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চে। আবেদনকারীর দাবি ছিল, আদালতে এআই ব্যবহারের কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকলে ভুল বা জাল রায় (fake judgments) তৈরির আশঙ্কা থাকে, যা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত শুনানির সময় স্পষ্ট জানিয়ে দেন, “আমরা এআই-কে অত্যন্ত সচেতনভাবে ব্যবহার করি। আমরা কখনোই চাই না যে এআই বা মেশিন লার্নিং আমাদের বিচারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে কোনোভাবে প্রভাবিত করুক।” আদালত মনে করে, এই ধরনের কারিগরি ও প্রশাসনিক সমস্যার সমাধান বিচারিক নির্দেশের চেয়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমেই হওয়া বাঞ্ছনীয়। শেষ পর্যন্ত আবেদনকারী মামলাটি প্রত্যাহার করতে রাজি হলে আদালত জানান যে, এ সংক্রান্ত কোনো গঠনমূলক পরামর্শ থাকলে তা ইমেইলের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনিক বিভাগে জমা দেওয়া যেতে পারে।
আবেদনকারীর উদ্বেগ ও যুক্তি
আবেদনকারীর পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, জেনারেটিভ এআই (Gen-AI) ব্যবহারের ফলে ‘হ্যালুসিনেশন’ বা ভিত্তিহীন তথ্য তৈরির ঝুঁকি থাকে। এর ফলে অস্তিত্বহীন আইন বা কেস প্রিসিডেন্ট তৈরি করে নিম্ন আদালতকে বিভ্রান্ত করা হতে পারে। আবেদনে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন, ডেটা স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং বিচার প্রক্রিয়ায় মানুষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রাখার দাবি জানানো হয়েছিল।
আদালতের দৃষ্টিভঙ্গি ও গুরুত্ব
আদালত মনে করে যে, এআই বিচারকের বিকল্প নয় বরং একটি সহায়ক সরঞ্জাম (Tool) মাত্র। নথিপত্র দ্রুত যাচাই বা গবেষণার কাজে এটি ব্যবহৃত হলেও মূল রায় বা সিদ্ধান্ত সর্বদা বিচারকের হাতেই থাকবে। বিচারিক অ্যাকাডেমিগুলোতে এআই-জেনারেটেড কন্টেন্ট যাচাই করার প্রশিক্ষণ এবং আইনজীবীদের সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই ঝুঁকি মোকাবিলা করা সম্ভব।
এই সিদ্ধান্তটি ভারতীয় বিচারব্যবস্থার আধুনিকীকরণের পথে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে যেমন প্রযুক্তি দ্রুত বিচার প্রাপ্তিতে সহায়তা করতে পারে, অন্যদিকে তার অপব্যবহার রোধে মানবিক যাচাই ও দায়বদ্ধতা বজায় রাখা জরুরি। সুপ্রিম কোর্ট এআই-কে একটি সীমাবদ্ধ টুল হিসেবে রাখার পক্ষেই সওয়াল করেছে, যাতে বিচারিক স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা অটুট থাকে।



