হাইকোর্ট

‘জীবিকা ও উপার্জনের অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না’: নাবালিকা কন্যাকে ধর্ষণের দায়ে সাজাপ্রাপ্ত সরকারি কর্মীকে জামিন দিল হাইকোর্ট

নাবালিকা কন্যাকে দিনের পর দিন যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত এক সরকারি কর্মচারীকে জামিন দিল এলাহাবাদ হাইকোর্ট। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আপিল মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে, আর সেই অনিশ্চিত সময় পর্যন্ত একজন ব্যক্তিকে কারারুদ্ধ রাখা অনুচিত। বিশেষত, অভিযুক্ত একজন সরকারি চাকুরিজীবী হওয়ায় তাঁর ‘জীবিকা নির্বাহের অধিকার’ বা উপার্জনের পথ অবারিত রাখা প্রয়োজন বলে মনে করেছে আদালত।

মামলার প্রেক্ষাপট ও লোমহর্ষক অভিযোগ

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম প্রবেশ সিং তোমর। তিনি পেশায় একজন ‘লেখপাল’ (গ্রাম পঞ্চায়েত স্তরের সরকারি রাজস্ব কর্মচারী)। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগটি ছিল অত্যন্ত গুরুতর ও স্পর্শকাতর। ২০২০ সালের ১২ জানুয়ারি তোমরের স্ত্রী থানায় একটি এফআইআর (FIR) দায়ের করেন। সেখানে উল্লেখ করা হয়, তোমর তাঁর নিজের ১৬ বছর বয়সী নাবালিকা কন্যাকে বছরের পর বছর ধরে শারীরিক ও যৌন নির্যাতন করে আসছিলেন।

অভিযোগে বলা হয়েছে, তোমর তাঁর কন্যাকে বাড়ি ছাড়াও বিভিন্ন হোটেল ও পর্যটন কেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে যৌন লালসা চরিতার্থ করতেন। শুধু তাই নয়, নির্যাতনের ফলে ওই নাবালিকা অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে, তোমর তাকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে গর্ভপাত করান। অভিযোগ অনুযায়ী, সেই সময় তিনি নিজের পিতৃপরিচয় গোপন রেখে অত্যন্ত অমানবিক আচরণ করেছিলেন। নিম্ন আদালত এই সমস্ত তথ্য ও প্রমাণ বিচার করে তাঁকে পকসো (POCSO) আইনের কঠোর ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে সাজা প্রদান করেছিল।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও জামিনের যুক্তি

নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে প্রবেশ সিং তোমর এলাহাবাদ হাইকোর্টে ফৌজদারি আপিল দায়ের করেন এবং সাজা স্থগিতের আবেদন জানান। বিচারপতিদের বেঞ্চ বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখেন যে, হাইকোর্টে আপিল মামলার শুনানি ও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হতে দীর্ঘ সময় লাগার সম্ভাবনা রয়েছে।

আদালত তাঁর পর্যবেক্ষণে জানায়, “তিনি একজন সরকারি কর্মচারী; কেবল মামলার বিচার চলছে বলেই তাঁর জীবিকা নির্বিঘ্নে রাখার অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না।” ভারতীয় সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ (Article 21) অনুযায়ী জীবনের অধিকার ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার কথা উল্লেখ করে আদালত জানায়, দীর্ঘ প্রতীক্ষার সময়কালে সাজাপ্রাপ্তকে কারাগারে আটকে রাখা ‘অন্যায্য’ হতে পারে। আদালত আরও স্পষ্ট করে যে, অপরাধের গুরুত্ব বিচার্য হলেও উপার্জনের অধিকার একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকারের অংশ, যা এই ক্ষেত্রে রক্ষা করা প্রয়োজন।

জামিনের শর্তাবলী

হাইকোর্ট তোমরের সাজা সাময়িকভাবে স্থগিত করে জামিন মঞ্জুর করেছে। তবে এই জামিন কিছু নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষ। আদালত নির্দেশ দিয়েছে যে, আবেদনকারীকে আইনি সমস্ত প্রক্রিয়া মেনে চলতে হবে এবং জরিমানার টাকা দ্রুত সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে। আদালত অপরাধের গুণাগুণ নিয়ে কোনো চূড়ান্ত মন্তব্য না করলেও, আইনি প্রক্রিয়া ও মানবিক অধিকারের ভারসাম্য বজায় রাখতেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

আইনি গুরুত্ব ও বিতর্ক

সাধারণত পকসো আইনের মতো গুরুতর মামলায় জামিন পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। আইনজ্ঞদের মতে, এই রায়টি ‘জীবিকার অধিকার’ ও ‘ব্যক্তিগত স্বাধীনতা’র প্রশ্নে একটি বিশেষ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। যদিও অতীতে বিভিন্ন আদালত ভিন্ন ভিন্ন পর্যবেক্ষণ দিয়েছে, তবে এলাহাবাদ হাইকোর্টের এই সিদ্ধান্ত আইনি মহলে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে—যেখানে অপরাধের ভয়াবহতার চেয়ে অভিযুক্তের নাগরিক অধিকারকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button