বুলডোজার সংস্কৃতিতে আদালতের কড়া চাবুক: নোটিশ ছাড়া বাড়ি ভাঙায় উত্তরপ্রদেশ সরকারকে ২০ লাখ টাকা জরিমানার নির্দেশ

আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে নাগরিকের সম্পত্তি ধ্বংস করা সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী—এলাহাবাদ হাইকোর্টের এই সাম্প্রতিক রায় উত্তরপ্রদেশ প্রশাসনের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। রায়বেরলি জেলার এক নাগরিকের জমি পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি রাজ্য সরকারকে ২০ লক্ষ টাকা জরিমানা প্রদানের নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
ঘটনার সূত্রপাত:
মামলাটি আবেদনকারী সাবিত্রী সোনকরের। তিনি ২০২১ সালে নিবন্ধিত বিক্রয় দলিলের (Registered Sale Deed) মাধ্যমে রায়বেরলি জেলায় একটি জমি কেনেন। ১৯৭৫ সালের একটি আদালতের ডিক্রি অনুযায়ী ওই জমির মালিকানা বৈধ ছিল এবং সরকারি রেকর্ডেও সাবিত্রীদেবীর নাম মিউটেশন করা হয়েছিল। কিন্তু আচমকাই ২০২৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি রায়বেরলির উপ-জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (SDM) কোনো নোটিশ বা শুনানি ছাড়াই রাজস্ব রেকর্ড থেকে আবেদনকারীর নাম মুছে দেন এবং জমিটি ‘গ্রাম সভা’র সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণা করেন।
প্রশাসনের একতরফা পদক্ষেপ:
অভিযোগ ওঠে, নায়েব তহসিলদারের একটি রিপোর্টের ভিত্তিতেই এসডিএম তড়িঘড়ি এই সিদ্ধান্ত নেন। কোনো আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই ২৪ মার্চ ২০২৫ তারিখে প্রশাসনের বুলডোজার গিয়ে জমির ওপর থাকা কাঠামো গুঁড়িয়ে দেয়। উদ্দেশ্য ছিল সেই জমিতে জিএসটি (GST) বিভাগের একটি ভবন নির্মাণ করা।
হাইকোর্টের কড়া পর্যবেক্ষণ:
বিচারপতি আলোক মথুরের বেঞ্চ এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। আদালতের প্রধান পর্যবেক্ষণগুলি হলো:
-
আইনের শাসন লঙ্ঘন: উত্তরপ্রদেশ রেভিনিউ কোডের ৩৮ নম্বর ধারা ব্যবহার করে শুধুমাত্র রেকর্ডের ভুল সংশোধন করা যায়, কিন্তু এর মাধ্যমে কারও জমির মালিকানা কেড়ে নেওয়া যায় না।
-
সংবিধানের ৩০০এ অনুচ্ছেদ: আদালত স্পষ্ট জানায়, উপযুক্ত আইনি প্রক্রিয়া (Due Process) ছাড়া কোনো নাগরিককে তাঁর সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা সংবিধানের ৩০০এ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন।
-
বুলডোজার নীতির সমালোচনা: সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক নির্দেশিকা অনুযায়ী, ভাঙার আগে নোটিশ দেওয়া এবং আপিল করার সময় দেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু এই ক্ষেত্রে প্রশাসন আইনকে তোয়াক্কা করেনি।
আদালতের চূড়ান্ত নির্দেশ:
আদালত এই মামলাটিকে প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে চিহ্নিত করে নিম্নলিখিত নির্দেশগুলি দিয়েছে: ১. ১০ ফেব্রুয়ারির ওই অবৈধ রাজস্ব আদেশ বাতিল করতে হবে। ২. আগামী ২ সপ্তাহের মধ্যে আবেদনকারীকে তাঁর জমির দখল বুঝিয়ে দিতে হবে। ৩. আগামী ২ মাসের মধ্যে রাজ্য সরকারকে ২০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে আবেদনকারীকে। ৪. ঘটনার সাথে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত এবং অতিরিক্ত চিফ সেক্রেটারি স্তরের কর্মকর্তাকে দিয়ে পৃথক তদন্ত করাতে হবে।
এই রায় প্রমাণ করল যে, প্রশাসনিক দাপট দেখিয়ে সাধারণ মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই কেড়ে নেওয়া যায় না এবং আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়।



