খবরাখবর

অনিল আম্বানি বনাম সংবাদমাধ্যম: মানহানি মামলা প্রত্যাহার ও আদালতের আসল নির্দেশ

ভারতের বিশিষ্ট শিল্পপতি অনিল ডি. আম্বানি দিল্লির আদালত থেকে সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে করা তাঁর বহুল আলোচিত মানহানি মামলাটি প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। তবে এই মামলা প্রত্যাহারের পাশাপাশি একটি বিভ্রান্তি ছড়িয়েছিল যে, আদালত তাঁকে ভবিষ্যতে পুনরায় মামলা করার স্বাধীনতা দিয়েছে। আসল খবর হলো, আদালতের লিখিত আদেশে নতুন করে মামলা করার কোনো বিশেষ অনুমতি বা স্বাধীনতার কথা উল্লেখ করা হয়নি। আদালত কেবল মামলাটি ‘প্রত্যাহার করা হয়েছে’ (Withdrawn) হিসেবে গ্রহণ করে ফাইল বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে।

ঘটনার নেপথ্যে কী ছিল?

অনিল আম্বানি ‘Cobrapost’, ‘The Economic Times’ এবং আরও কিছু সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে দিল্লির করকারদূমা সিভিল কোর্টে একটি মানহানি মামলা দায়ের করেছিলেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, এই সংবাদমাধ্যমগুলো তাঁর সংস্থার বিরুদ্ধে ৪১,০০০ কোটি টাকারও বেশি অর্থ জালিয়াতির খবর প্রকাশ করে তাঁর এবং তাঁর ব্যবসার সুনাম নষ্ট করেছে। তিনি দাবি জানিয়েছিলেন যাতে আদালত অবিলম্বে ওই প্রতিবেদনগুলো ইন্টারনেট থেকে সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেয়।

কেন মামলাটি তুলে নেওয়া হলো?

মামলাটি তুলে নেওয়ার পেছনে আদালতের একটি আগের পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ১৭ নভেম্বর ২০২৫-এ আদালত আম্বানির একটি বিশেষ আবেদন (Ex Parte Injunction) নাকচ করে দেয়। আম্বানি চেয়েছিলেন যাতে অভিযুক্ত সংবাদমাধ্যমগুলোর বক্তব্য শোনার আগেই আদালত প্রতিবেদনগুলো সরানোর নির্দেশ দেয়। কিন্তু বিচারক সাফ জানিয়ে দেন যে, সংবাদমাধ্যমের কথা না শুনে এমন নিষেধাজ্ঞা জারি করা সম্ভব নয়।

আদালত আরও পর্যবেক্ষণ করেছিল যে, যথাযথ বিচার ছাড়া কোনো খবর প্রকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা ভারতের সংবিধানের ১৯(১)(এ) ধারায় প্রদত্ত ‘বাক-স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা’র ওপর হস্তক্ষেপ হতে পারে। এই ধাক্কার পরেই আম্বানির আইনজীবীরা মামলাটি আর না এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং ১০ ডিসেম্বর ২০২৫-এ তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।

বিভ্রান্তি বনাম বাস্তবতা

অনেক জায়গায় খবর রটেছিল যে, অনিল আম্বানিকে ভবিষ্যতে নতুন করে ফ্রেশ মামলা করার স্বাধীনতা (Liberty to file afresh) দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আদালতের মূল আদেশে এমন কোনো আইনি রক্ষাকবচ বা স্পষ্ট নির্দেশের হদিস মেলেনি। সাধারণ আইনি প্রক্রিয়ায় কোনো মামলা নিঃশর্তভাবে তুলে নিলে ভবিষ্যতে একই বিষয়ে মামলা করার সুযোগ সংকুচিত হয়ে যায়, যদি না আদালত বিশেষ অনুমতি প্রদান করে। এক্ষেত্রে আদালত কেবল মামলাটি বন্ধ করে নথি রেকর্ড রুমে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে।

সারসংক্ষেপ ও বর্তমান পরিস্থিতি

এই মামলাটি প্রত্যাহারের ফলে সংবাদমাধ্যমগুলোর বিরুদ্ধে আনা মানহানির অভিযোগের সত্যতা বা মিথ্যা নিয়ে কোনো বিচারিক সিদ্ধান্ত হলো না। অর্থাৎ, মূল বিষয়টি এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেল। ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে যে শুনানি হওয়ার কথা ছিল, মামলা প্রত্যাহারের ফলে তা বাতিল করা হয়েছে।

এই ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করল যে, ভারতের বিচারব্যবস্থা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশের অধিকারকে কতটা গুরুত্ব দেয়। যথাযথ তথ্যপ্রমাণ ছাড়া কেবল বড় কোনো ব্যক্তিত্বের আপত্তিতে সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করা যে সহজ নয়, আদালতের এই অবস্থান থেকে তা পরিষ্কার।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button