সম্পাদকীয়

বাংলাদেশের ভঙ্গুর আইনশৃঙ্খলা ও সাংবিধানিক সংকটের নেপথ্য কারণ—একটি নির্মোহ বিশ্লেষণ

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে চরম অবনতি পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা কেবল কোনো তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; বরং এটি দীর্ঘদিনের কাঠামোগত, সাংস্কৃতিক এবং আদর্শিক সংঘাতের এক অনিবার্য বহিঃপ্রকাশ। একটি রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা তখনই সুসংহত থাকে যখন সে দেশের সাধারণ নাগরিক এবং রাষ্ট্রের পরিচালক যন্ত্র—সংবিধানের মূল দর্শনের সঙ্গে একাত্ম হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, রাষ্ট্র যে আধুনিক গণতান্ত্রিক কাঠামো নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তার সঙ্গে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মনস্তাত্ত্বিক ও ধর্মীয় বিশ্বাসের এক গভীর ব্যবধান তৈরি হয়েছে।

সাংবিধানিক কাঠামো বনাম ধর্মীয় জাতিসত্তা

বাংলাদেশের সংবিধান মূলত একটি ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক এবং আধুনিক বিচার ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে রচিত হয়েছিল। যেখানে পুলিশ প্রশাসন ও বিচার বিভাগকে সাজানো হয়েছে ব্রিটিশ আমল থেকে চলে আসা ওয়েস্টার্ন বা আধুনিক মডেলে। কিন্তু সমস্যাটি প্রকট হয় যখন এই আরোপিত কাঠামোটি দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর ইসলামিক জাতিসত্তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে। সংবিধান বলছে সার্বভৌমত্ব জনগণের, কিন্তু ধর্মীয় আদর্শে বিশ্বাসী মানুষের বড় একটি অংশ মনে করে সার্বভৌমত্ব একমাত্র স্রষ্টার। এই মৌলিক বিশ্বাসের অমিল বিচার ব্যবস্থা ও পুলিশ প্রশাসনের প্রতি জনগণের আস্থা ও আনুগত্যকে শিথিল করে দিয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রের আইনের চেয়ে ধর্মীয় বিধান বা সামাজিক অনুশাসনকে অধিক শক্তিশালী মনে করে, যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দুর্বল করে ফেলে।

আদর্শিক বিশ্বাস বনাম সংবিধানের ভিত্তি

একটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার প্রধান শর্ত হলো নাগরিকদের কাছে সংবিধানের গ্রহণযোগ্যতা। বাংলাদেশে এক বিশাল সংখ্যক নাগরিক ইসলামিক আদর্শকে এতটাই প্রগাঢ়ভাবে ধারণ করে যে, তাদের কাছে পশ্চিমা ধাচের এই সংবিধান প্রায়ই ভিত্তিহীন বা নিছক একটি কাগুজে দলিল মনে হয়। যখনই ধর্মীয় আবেগ ও রাষ্ট্রের আইনের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে, তখন নাগরিকরা আইন ভাঙতে দ্বিধা বোধ করে না। এই মনস্তাত্ত্বিক অবস্থানের কারণে অপরাধ দমনে পুলিশ যখন কঠোর হয়, তখন তাকে ‘আইন রক্ষা’ হিসেবে না দেখে ‘ধর্মীয় বা ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ’ হিসেবে দেখা হয়। এই নৈতিক ভিত্তিহীনতা অপরাধীদের মনে বিচারহীনতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সাহায্য করে।

ভঙ্গুর শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মৌলবাদের উত্থান

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির পেছনে একটি গভীর অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংকট কাজ করে। যখন কোনো জাতির আর্থিক কাঠামো দুর্বল হয়, আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যর্থ হয় এবং বিজ্ঞান ও শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা ব্যাহত হয়, তখন সমাজে এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, গ্রামীণ ও আদি লোকজ সংস্কৃতি যখন অবক্ষয়ের শিকার হয়েছে, তখন সেই শূন্যস্থান দখল করেছে একটি বিশেষ ধর্মীয় ভাবাদর্শ।

এই ভাবাদর্শের আড়ালে শুরু হয় দুর্বৃত্তায়ন। ক্ষমতালোভী রাজনৈতিক পক্ষগুলো এই ধর্মীয় ভাবাবেগকে পুঁজি করে নিজেদের আখের গুছিয়ে নেয়। যখন ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন অপরাধীরা ধর্মীয় লেবাস পরে আইনের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যায়। বিজ্ঞানমনস্কতা ও আধুনিক শিক্ষার অভাব তরুণ প্রজন্মকে বিচারবুদ্ধিহীন করে তোলে, যার ফলে তারা খুব সহজেই উগ্রবাদী চিন্তা বা অরাজকতায় জড়িয়ে পড়ে।

ভূ-রাজনৈতিক শত্রুতা ও গণতন্ত্রের সংকট

বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের এক গভীর প্রভাব রয়েছে। দেশের একটি বড় গোষ্ঠী যখন নিজেদের ধর্মীয় ভাবাদর্শের কারণে ভারতকে শত্রু হিসেবে গণ্য করে, তখন তার প্রতিফলন দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও সংবিধানেও পড়ে। উগ্র জাতীয়তাবাদ ও ভারত-বিদ্বেষকে যখন রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভেঙে ফেলার এক অদম্য প্রয়াস চলে। শত্রুপক্ষ মোকাবিলা করার নাম করে যখন রাষ্ট্রযন্ত্রকে দলীয়করণ করা হয় এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করা হয়, তখন পুলিশ ও সেনাবাহিনী তাদের নিরপেক্ষতা হারায়। ফলে সাধারণ অপরাধীরাও রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায়।

 উপসংহার

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব দেশে রাষ্ট্রের আইনি কাঠামো এবং সমাজের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য নেই, সেসব দেশে অপরাধের হার বেশি এবং পুলিশের কার্যকারিতা কম। বাংলাদেশে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, পুলিশের রাজনৈতিক ব্যবহার এবং বিচার বিভাগের ধীরগতি এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের বিভিন্ন রিপোর্টেও উঠে এসেছে যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুর্নীতি ও রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব সাধারণ মানুষকে আইনের প্রতি বিমুখ করে তুলছে।

পরিশেষে, বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেবল প্রশাসনিক সংস্কার দিয়ে ঠিক করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদী সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাগত সংস্কার। রাষ্ট্রের সংবিধানকে যদি সাধারণ মানুষের জীবনদর্শন ও বিশ্বাসের সঙ্গে সমন্বয় করা না যায় এবং উগ্র ভাবাদর্শের বদলে আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষা নিশ্চিত করা না যায়, তবে এই অস্থিরতা চলতেই থাকবে। আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা কেবল পুলিশের দায়িত্ব নয়, এটি রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকদের অগাধ বিশ্বাস ও সম্মানের বহিঃপ্রকাশ। আর সেই সম্মান তখনই আসবে যখন রাষ্ট্র ও নাগরিক একই আদর্শিক সূতোয় বাঁধা পড়বে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button