সম্পাদকীয়

ওসমান হাদির মৃত্যু ও বাংলাদেশের আগামীর পথ: ধর্মীয় ভাবাবেগ বনাম গভীরতর রাষ্ট্রীয় সংকট

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে ওসমান হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে যে ধরনের রাজনৈতিক উন্মাদনা ও বয়ান তৈরি করা হচ্ছে, তা দেশের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার জন্য এক অশনিসংকেত। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি শোকের পরিবেশ মনে হলেও, এর গভীরে লুকিয়ে আছে রাষ্ট্র পরিচালনার চরম ব্যর্থতা, সুপরিকল্পিত ভারত-বিদ্বেষ এবং জঙ্গিবাদের একটি নতুন বৈশ্বিক মডেল প্রতিস্থাপনের বিপজ্জনক অভিসন্ধি।

অর্থনৈতিক সংকট ও ডাইভারশন পলিটিক্স

বর্তমানে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নিত্যপণ্যের আকাশচুম্বী দাম, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের টানাপোড়েন এবং শিল্পোৎপাদনে স্থবিরতা জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। ঐতিহাসিক সত্য হলো, যখন কোনো সরকার জনগণের অন্ন-বস্ত্রের সংস্থান করতে ব্যর্থ হয়, তখন তারা জনগণের নজর ঘোরাতে একটি ‘আবেগপ্রবণ ইস্যু’ খোঁজে। ওসমান হাদির মৃত্যুকে অত্যধিক মাত্রায় গ্লোরিফাই (মহিমান্বিত) করা সেই ‘ডাইভারশন পলিটিক্স’-এরই অংশ। সাধারণ মানুষের পেটের ক্ষিধেকে যখন পরকালের জান্নাত বা বীরত্বের বীরগাঁথা দিয়ে ভুলিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়, তখন বুঝতে হবে রাষ্ট্রের মূল কাঠামোতে ঘুণ ধরেছে।

শ্রমবাজারের সংকট ও জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি

বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হলো রেমিট্যান্স। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পটপরিবর্তনের পর এই ক্ষেত্রটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। অভিযোগ উঠেছে যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পাসপোর্ট ভেরিফিকেশন পদ্ধতি শিথিল করায় জেল থেকে মুক্তি পাওয়া কুখ্যাত জঙ্গি, খুনি ও চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা পরিচয় বদলে বিদেশে পাড়ি দিচ্ছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশিদের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যসহ অনেক উন্নত দেশ বাংলাদেশি শ্রমিক নিতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছে, কারণ তারা আশঙ্কা করছে সাধারণ শ্রমিকের বেশে কোনো প্রশিক্ষিত জঙ্গি বা সন্ত্রাসী তাদের দেশে প্রবেশ করছে। কর্মসংস্থানের এই পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া বাংলাদেশের জন্য এক দীর্ঘমেয়াদী আত্মঘাতী পদক্ষেপ।

মৌলিক পরিষেবার বদলে ধর্মের নেশা

একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখতে হলে সরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক পরিষেবায় বিনিয়োগ করতে হয়। কিন্তু এই পথে সাফল্য আনা কঠিন এবং পরিশ্রমসাপেক্ষ। তার চেয়ে অনেক সহজ উপায় হলো জনগণের মধ্যে ‘ধর্মের নেশা’ ধরিয়ে দেওয়া। বর্তমান পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, প্রশাসনিক সংস্কার বা উন্নয়নের বদলে ধর্মীয় আবেগ ও উগ্রতাকে রাষ্ট্রীয় মদত দেওয়া হচ্ছে। এটি মূলত দুর্বৃত্তায়নকে প্রশ্রয় দেওয়ার একটি কৌশল। যখন একদল যুবক ধর্মীয় উন্মাদনায় বুঁদ হয়ে থাকে, তখন তারা সরকারের কাছে ভালো স্কুল বা হাসপাতালের দাবি তোলে না, বরং কাল্পনিক শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মেতে ওঠে।

উগ্রবাদের নতুন মডেল ও হাদি-দর্শন

আন্তর্জাতিক মহলে আল-কায়েদা বা আইসিসের মতো উগ্রবাদী সংগঠনগুলোর একটি নির্দিষ্ট সংজ্ঞা ও ইতিহাস রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে এখন যে মডেলটি দাঁড় করানোর চেষ্টা চলছে, তা কিছুটা ভিন্ন ও অভিনব। ওসমান হাদির মৃত্যুকে সামনে রেখে তাঁর উগ্রবাদী আদর্শকে তরুণ প্রজন্মের আইকন হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। অথচ হাদির কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি ধানমন্ডি ৩২-এর মতো জাতীয় স্মারক ধ্বংস, প্রতিবেশী দেশ ভারতের সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করা এবং ম্যাপ বিকৃত করার মতো উসকানিমূলক কাজে লিপ্ত ছিলেন। এমনকি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে, জুলাই অভ্যুত্থানের সময় পুলিশ হত্যা এবং সরকারি অবকাঠামো ভাঙচুর ছিল তাঁদের বড় সাফল্য। এই সহিংসতাকে যখন ‘বিপ্লব’ বা ‘জিহাদ’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে গ্লোরিফাই করা হয়, তখন সেটি সরাসরি বিশ্ব জঙ্গিবাদের নতুন একটি আঞ্চলিক মডেলকেই ইঙ্গিত করে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অভিসন্ধি ও ‘পাকিস্তান মডেল’

বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও নির্বাচন নিয়ে যে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে, তার পেছনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একটি সূক্ষ্ম পরিকল্পনা কাজ করছে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন। উদ্দেশ্য হলো—এমন এক পরিস্থিতি বজায় রাখা যাতে নির্বাচন অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে দেওয়া যায়। আর এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশে এমন একটি জঙ্গিবাদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা, যা হবে সম্পূর্ণ ভারত-বিদ্বেষী।

এটি অনেকটা পাকিস্তানের পুরনো মডেল ‘ব্লিড ইন্ডিয়া উইথ থাউজেন্ড কাটস’ (হাজারো ক্ষতের মাধ্যমে ভারতকে রক্তক্ষরণ ঘটানো)-এর একটি বাংলাদেশি সংস্করণ। ভারতের প্রতি এই তীব্র বিদ্বেষকে পুঁজি করে উগ্রবাদকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রের দিকে ঠেলে দিতে পারে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে শত্রুতা বৃদ্ধি করে এবং উগ্রবাদী গোষ্ঠীকে মূল ধারায় এনে সরকার নিজের ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করতে চাইলেও, এর চরম মূল্য দিতে হবে দেশের সাধারণ নাগরিকদের।

উপসংহার

ওসমান হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে যে মহিমান্বিত প্রচার চলছে, তা আসলে বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয় ও নিরাপত্তার ওপর এক ভয়াবহ আঘাত। ধর্মীয় উন্মাদনা দিয়ে সাময়িকভাবে মানুষের ক্ষোভ চাপা দেওয়া গেলেও, কর্মসংস্থানহীনতা ও বিচ্ছিন্নতাবাদ দেশকে এক অন্ধকার গহ্বরের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সময় এসেছে এই ‘জঙ্গি মডেল’ চেনার এবং দেশকে ধ্বংসাত্মক রাজনীতির হাত থেকে রক্ষা করার।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button