
পূর্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়- অলীক কুনাট্য রঙ্গে, মজে লোক রাঢ়ে বঙ্গে, নিরখিয়া প্রাণে নাহি সয়। এক অসাধারণ সাহিত্যগুণে ভরপুর ঈশ্বরপ্রদত্ত প্রতিভা ছিলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েও, কুল পাননি তিনি, অবশেষে তিনি নিজমাতৃভূমেই বাংলা ভাষার এক অনন্য মূল্যবান খনিজ আবিষ্কার করেছিলেন।
কলকাতা থেকে সাগরদাঁড়ির দূরত্ব কতদূর? বসিরহাট ঘোজাডাঙ্গা হয়ে ১৬০ কিলোমিটারের কিছু বেশি! মধুরসূদনের পৈতৃক বাড়ির পাশে বয়ে চলা কপোতাক্ষ নদ মজে গিয়েছে। স্মৃতির অন্তরালে চলে গিয়েছে, এক করুণ ইতিহাস। কলকাতা লোয়ার সার্কুলার রোডের একটি গোরস্তানে শায়িত রয়েছে মধুর নশ্বর শরীর। তিনি কি কলকাতার বুকে ঘটে যাওয়া আধুনিক কবি, বুদ্ধিজীবীদের কবিতা কাকলির ধ্বনি শুনতে পান? কোনও এক ক্ষণজন্মার সৃষ্ট সঙ্গীতের মূর্চ্ছনায় তাঁরা মাথা নাড়েন। সেই ক্ষণজন্মার বিচিত্র তুলির ছোঁয়ায় যখন বিরল প্রজাতির অ্যামিবার জন্ম হয়, তখন আধুনিক শিল্পীকুল আনন্দে উদ্বেল হয়ে ওঠে, আহা কী দেখিলাম সহস্রাব্দের শিল্প কর্ম।
মাইকেলের প্রতিভা অস্তমিত হয়েছি ব্রিটিশ শাসন কালেই, তারপর হুগলি নদীর বুক দিয়ে বয়ে গিয়েছে বহু জল। ভারতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে নতুন শাসন ব্যবস্থা। যদিও, ইংরেজ শাসনকালের বৃহৎ লাঙ্গুল এখনও বর্তমান। আর এই লাঙ্গুলনামা নিয়েই বঙ্গভূমে হয়ে গেল এক অদ্ভুত রঙ্গলীলা।
রাজভবনের আবডালে
কলকাতায় রাজভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয় ১৭৯৯ সালে। তদনীন্তন গভর্নর-জেনারেল লর্ড ওয়েলেসলির রাজত্বকালে গভর্নমেন্ট হাউসের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। দ্য বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ার্স-এর ক্যাপ্টেন চার্লস ওয়াট ডার্বিশায়ারে অবস্থিত লর্ড কার্জনের পিতৃপুরুষের ভিটে কেডলেসটন হলের আদলে এই প্রাসাদের নকশা করা হয়। ১৮০৩ সালে এই ভবনের নির্মাণকার্য সমাপ্ত হয়। এই বছর ২৬ জানুয়ারি এক বর্ণাঢ্য বল নাচের আসরের মাধ্যমে গভর্নমেন্ট হাউসের উদ্বোধন করা হয়। সেই সময় রাজভবনে ব্রিটিশ সাহেবরা কী করতেন? কেমন বিলাস ব্যসনে থাকতেন তা আজও গবেষণার বিষয়। কিন্তু এই রাজভবনের কি কোনও কলঙ্কিত অধ্যায় আছে হয়তো আছে, বা হয়তো নেই।
রাজভবনের বন্দি
২০২২ সালে ১৭ নভেম্বর পশ্চিমবঙ্গে রাজ্যপালের দায়িত্ব গ্রহণ করেন সিভি আনন্দ বোস। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তাঁকে বারবার দেখা গিয়েছে ছকভাঙা ছন্দে। একাধিকবার সরকারপক্ষের সঙ্গে সম্মুখ সমরে নেমেছিলেন তিনি। নজিরবিহীন ভাবে তাঁর বিরুদ্ধে পুলিশি মামলা হতেও দেখা গিয়েছে। রাজভবনে বোমা অস্ত্র রাখা আছে এই অভিযোগও ওঠে, আর সেই অভিযোগের ভিত্তিতে রাজভবনে স্নিফার ডগ নিয়ে তদন্তও করে পুলিশ। রাজ্যের গণ্ডী পেরিয়ে দেশবাসী দেখেছিল, এই ভিষণ যুদ্ধ। সরকারপক্ষ বনাম রাজ্যপালের সংঘাত কতটা চরমে ছিল। এমন শত্রুতায় আচমকাই অদ্ভুত সন্ধি দেখা গেল তখন, যখন সময়ের আগেই পদত্যাগ করতে হল সিভি আনন্দ বোসকে। তাঁর জায়গায় দায়িত্ব নিলেন রবীন্দ্র নারায়ণ রবি। তিনি ছিলেন দুঁদে গোয়েন্দা কর্মকর্তা। পশ্চিমবঙ্গের দায়িত্ব নেওয়ার আগে তামিলনাড়ুর রাজ্যপাল হিসেবে ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধেই অভিযোগ ওঠে, একাধিক বিল তিনি দিনের পর দিন আটকে রেখেছেন। মামলা গড়ায় সুপ্রিম কোর্টে। অবশেষে বিজয় পান আর এন রবি। হ্যাঁ তিনিই এসেছেন খাস কলকাতায়।
অশোকবনের গোপন কথা
ভারতের প্রচীন ইতিহাসের পাতা খুললে দেখা যায় রাজনীতিতে নারীদের ভূমিকা অসীম। একথা পুরাণেও রয়েছে। যেমন ধরা যাক বিশ্বামিত্র ও মেনকার কাহিনী। একবার ঋষি বিশ্বামিত্র একটি অত্যন্ত কঠিন তপস্যা করছিলেন। দেবরাজ ইন্দ্র ভয় পেয়েছিলেন যে একবার তপস্যা সম্পন্ন হলে বিশ্বামিত্রকে অত্যন্ত শক্তিশালী করে তুলবে এবং তিনি স্বর্গ জয় করতে সক্ষম হবেন। তাই ইন্দ্র তাঁর সভাসদদের একজন সুন্দরী নৃত্যশিল্পী মেনকাকে পৃথিবীতে পাঠান।
ইতিমধ্যে, বিশ্বামিত্র সমস্ত আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেছিলেন এবং ধ্যানে নিযুক্ত ছিলেন, যা তাঁর তপস্যা সম্পন্ন করবে। মেনকা বনে গেলেন যেখানে বিশ্বামিত্র চোখ বন্ধ করে বসে ছিলেন। তিনি গান গাইতেন, নাচতেন, সুগন্ধি ফুলের মালা তৈরি করে বিশ্বামিত্রের মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য তাঁর গলায় পরিয়ে দিতেন। এই সমস্ত কিছু বিশ্বামিত্রকে বিরক্ত করে এবং তিনি চোখ খুললেন। তাঁর ধ্যান ভেঙে গেল। মেনকার সৌন্দর্য দেখে তিনি তাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন। তারা বিয়ে করেছিলেন এবং একটি কন্যা সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন। পৃথিবীতে মেনকার উদ্দেশ্য শেষ হয়ে গেলে, তিনি একজন দুঃখী বিশ্বামিত্রকে রেখে স্বর্গে ফিরে যান।
প্রচীন ভারতে এমন পুরাণ কাহিনী লোকশ্রুতিতে বেঁচে থাকত। সময়ের হাত ধরে, তা বন্দি হয়েছে কালো হরফে সাদা পাতায়। আধুনিক সময়ে আরও অত্যাধুনিক যন্ত্র এসেছে, যারে ক্যামেরা বলে। তার স্মৃতি সাধারণ মানুষের স্মৃতির থেকেও ভয়ঙ্কর। ভারতের ১৮টি মহাপুরাণ রয়েছে। কিছু নামে, কিছু বেনামে। অর্থাৎ, সেই সমস্ত পুরাণের আসল রচয়িতা কে কেউই জানে না। আধুনিক সময়েও এমন নৈতিক কাহিনী ক্যামেরা বন্দি হয়, তার অন্তরালে সূত্র সঞ্চালক কে বা রচয়িতা কে? ইতিহাসে লিপিবদ্ধ থাকে না। কিন্তু ‘বিশ্বমিত্ররা’ কামবানে বধ হন।
‘পদ্ম’পাতায় জল
মৌর্য সম্রাট অশোকের তিন সন্তান ছিলেন, মাহিন্দা, কুণাল এবং তিভালা। কলিঙ্গ জয়ের পর অশোক যখন ধম্মকম্মে লিপ্ত হলেন, রাজপাটের দায়িত্ব নিয়েছিলেন কুণাল। এই নামের আরও অর্থ রয়েছে, সেটি হল পদ্ম। আর পদ্মপাতায় জল কখনও স্থির থাকে না। পদ্মপাতায় জল স্থির হয়ে রয়েছে, এমন একটি দৃশ্যপট ধারণ করতে একজন চিত্রগ্রাহককে অনেক কসরত করতে হয়। সাম্রাজ্য ধরে রাখতেও এমন বহু কসরত করতে হয়। বিশেষ করে চারিত্রিক আলোছায়াকে কব্জা করতে।
ডিসক্লেমার- পুরাণ, ইতিহাসের গল্পের সঙ্গে ও বর্তমান রাজ্যপালের পদত্যাগের কোনও যোগ নেই। এখানে মূলত, ক্ষমতা ও তার ঐতিহ্যের তুলনা টানতে প্রকাশ করা হয়েছে।



