মুম্বই বিমানবন্দরে নামাজ পড়ার অনুমতি নয়: ‘নিরাপত্তাই অগ্রাধিকার’, সাফ জানাল বোম্বে হাইকোর্ট
মুম্বইয়ের ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (CSMIA) চত্বরে নামাজ পড়ার অনুমতি চেয়ে করা আবেদন খারিজ করে দিল বোম্বে হাইকোর্ট। আদালত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে, বিমানবন্দরের মতো অতি-সংবেদনশীল এলাকায় নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনোভাবেই আপস করা সম্ভব নয় এবং সেখানে ধর্মীয় অনুশীলনের জন্য বিশেষ ছাড় দেওয়া যাবে না।
মামলার প্রেক্ষাপট ও আবেদনকারীদের দাবি
মুম্বই বিমানবন্দরের বাইরে ট্যাক্সি, অটো এবং অ্যাপ-ভিত্তিক ক্যাব চালকদের একটি সংগঠন এই জনস্বার্থ মামলাটি দায়ের করেছিল। আবেদনকারীদের দাবি ছিল, গত ৩০ বছর ধরে বিমানবন্দরের একটি নির্দিষ্ট শেডে তাঁরা নামাজ পড়ে আসছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ সেই শেডটি ভেঙে দিয়েছে। বিশেষ করে রমজান মাসে চালক ও মুসলিম যাত্রীদের সুবিধার্থে বিমানবন্দর চত্বরের কাছাকাছি কোনো একটি অস্থায়ী স্থানে নামাজ পড়ার অনুমতি দেওয়ার জন্য তাঁরা আদালতের দ্বারস্থ হন।
আদালতের পর্যবেক্ষণ: ‘নিরাপত্তা সর্বাগ্রে’
বৃহস্পতিবার বিচারপতি Justice Burgess Colabawalla এবং বিচারপতি Justice Firdosh Pooniwalla-এর ডিভিশন বেঞ্চ এই মামলার রায় দান করেন। শুনানির সময় আদালত অত্যন্ত কড়া ভাষায় জানায়:
“সে ধর্ম হোক বা অন্য কিছু—নিরাপত্তাই সবকিছুর ঊর্ধ্বে। বিমানবন্দর একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল জায়গা যেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ যাতায়াত করেন। কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের জন্য এখানে আলাদা করে নিয়ম শিথিল করা সম্ভব নয়।”
আদালত আরও পর্যবেক্ষণ করে যে, বর্তমানে বিমানবন্দর এলাকায় বড়সড় পুনর্গঠন ও উন্নয়নের কাজ চলছে। এই অবস্থায় কোনো ধরনের জমায়েত বা ধর্মীয় সমাবেশের অনুমতি দিলে তা নিরাপত্তা ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
সরকারের রিপোর্ট ও বিকল্প জায়গার অভাব
মহারাষ্ট্র সরকারের পক্ষে অতিরিক্ত সরকারি আইনজীবী জ্যোতি চাভান আদালতে একটি বিস্তারিত রিপোর্ট পেশ করেন। সেই রিপোর্টে জানানো হয়, পুলিশ, বিমানবন্দরের প্রধান নিরাপত্তা আধিকারিক এবং ‘অ্যান্টি-টেররিজম সেল’ (ATC) যৌথভাবে বিষয়টি খতিয়ে দেখেছে। তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিমানবন্দর চত্বরে নামাজ পড়ার অনুমতি দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।
প্রশাসন আদালতকে জানায় যে, তাঁরা অন্তত সাতটি বিকল্প জায়গা পরীক্ষা করে দেখেছিলেন। কিন্তু প্রতিটি জায়গাতেই নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমস্যা বা অবকাঠামোগত ত্রুটি থাকায় শেষ পর্যন্ত কোনো জায়গাই উপযুক্ত বলে বিবেচিত হয়নি।
বৈষম্যের অভিযোগ ও আদালতের জবাব
আবেদনকারীদের আইনজীবী যুক্তি দেন যে, বিমানবন্দর চত্বরে যদি দুটি হনুমান মন্দির থাকতে পারে, তবে মুসলিমদের নামাজ পড়তে বাধা দেওয়া কেন বৈষম্যমূলক হবে না? এর জবাবে আদালত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করে। বেঞ্চ জানায়, যদি ওই মন্দিরগুলো অবৈধ হয় বা নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে, তবে কর্তৃপক্ষ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু “অন্য কেউ ভুল করছে বলে আপনিও একই ভুল করার অধিকার পাবেন না।”
আদালত আরও যোগ করে যে, নামাজ পড়ার ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা জারি করা হচ্ছে না। চালকরা চাইলে নিকটবর্তী কোনো মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়তে পারেন। কিন্তু বিমানবন্দরের উচ্চ-নিরাপত্তা বলয়ের ভেতরে এই ধরনের সমাবেশের অনুমতি দেওয়া ভবিষ্যতে আরও জটিল আইনি ও প্রশাসনিক সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
সব দিক বিবেচনা করে বোম্বে হাইকোর্ট আবেদনটি খারিজ করে দেয়। আদালত জানিয়ে দেয়, নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে প্রশাসনের পেশাদার সিদ্ধান্তে বিচার বিভাগ হস্তক্ষেপ করতে চায় না। বিমানবন্দরের নিরাপত্তার স্বার্থে প্রশাসনের নেওয়া সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।



