হাইকোর্ট

ফোনে জাতিগত গালিগালাজ SC/ST আইনের আওতায় পড়ে না: গুরুত্বপূর্ণ রায় কলকাতা হাইকোর্টের

ফোনে ব্যক্তিগত কথোপকথনের সময় কাউকে জাতিগত বিদ্বেষমূলক মন্তব্য বা গালিগালাজ করলে তা তফশিলি জাতি ও তফশিলি উপজাতি (অত্যাচার প্রতিরোধ) আইন বা SC/ST আইনের আওতায় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে না। সম্প্রতি একটি মামলার আগাম জামিনের আবেদনের শুনানিতে এই গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট। আদালত স্পষ্ট করেছে যে, এই আইনের অধীনে কোনো অপরাধ গঠিত হতে হলে সেই অপমানজনক মন্তব্য অবশ্যই জনসাধারণের সামনে বা ‘পাবলিক ভিউ’-তে হতে হবে।

ঘটনার প্রেক্ষাপট

মামলাটি গড়ে উঠেছিল জনৈক নূরুল আরাস-এর বিরুদ্ধে করা একটি অভিযোগকে কেন্দ্র করে। অভিযোগকারীর দাবি ছিল, নূরুল আরাস তাকে ফোনের মাধ্যমে জাতি তুলে গালিগালাজ এবং অপমান করেছেন। এই ঘটনায় ভারতীয় দণ্ডবিধির পাশাপাশি SC/ST (Prevention of Atrocities) Act-এর ৩(১)(r) এবং ৩(১)(s) ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে গ্রেফতারি এড়াতে অভিযুক্ত ব্যক্তি ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (BNSS) অনুযায়ী হাইকোর্টে আগাম জামিনের আবেদন জানান।

আবেদনকারীর যুক্তি

আবেদনকারীর পক্ষের আইনজীবী আদালতে যুক্তি দেন যে, SC/ST আইনের অধীনে মামলা করার জন্য প্রাথমিক শর্ত হলো—কথিত অপমানজনক ঘটনাটি জনসাধারণের উপস্থিতিতে ঘটতে হবে। যেহেতু গালিগালাজ বা অপমানের ঘটনাটি শুধুমাত্র একটি ফোন কলের মাধ্যমে ব্যক্তিগতভাবে ঘটেছে, সেখানে অন্য কোনো তৃতীয় ব্যক্তি বা সাধারণ মানুষ উপস্থিত ছিলেন না। তাই এখানে এই বিশেষ আইনটি প্রয়োগ করা আইনগতভাবে সঠিক নয়।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও ‘পাবলিক ভিউ’

কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি মামলাটি পর্যালোচনার পর আবেদনকারীর যুক্তির সঙ্গে একমত পোষণ করেন। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়:

  • জনসমক্ষে উপস্থিতি জরুরি: SC/ST আইনের মূল উদ্দেশ্য হলো প্রকাশ্যে কোনো ব্যক্তিকে তার জাতির কারণে ছোট করা থেকে রক্ষা করা। আইনের ভাষায় একে ‘পাবলিক ভিউ’ বলা হয়।

  • ফোন কল বনাম পাবলিক প্লেস: ফোনে করা গালিগালাজ কোনোভাবেই জনসমক্ষে করা অপমানের সমতুল্য নয়। কারণ, ফোনে কথা বলার সময় জনসাধারণের সেটি শোনার সুযোগ থাকে না।

  • আইনের প্রয়োগ: প্রাথমিক বিচারে আদালত মনে করেছে, যেহেতু অভিযোগটি ব্যক্তিগত ফোন কলের ভিত্তিতে করা হয়েছে, তাই এখানে SC/ST আইনের কঠোর ধারাগুলো প্রযোজ্য হওয়ার কোনো আইনি ভিত্তি নেই।

আদালতের নির্দেশ

হাইকোর্ট আবেদনকারীকে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করে নিয়মিত জামিনের (Regular Bail) আবেদন করার নির্দেশ দিয়েছে। তবে অভিযুক্তের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আদালত জানিয়েছে যে, নিম্ন আদালতে জামিন আবেদনের শুনানি না হওয়া পর্যন্ত আগামী চার সপ্তাহ তাকে গ্রেফতার করা যাবে না। অর্থাৎ, আদালত তাকে সাময়িক অন্তর্বর্তীকালীন সুরক্ষা প্রদান করেছে।

সারকথা

এই রায়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কারণ এটি SC/ST আইনের অপব্যবহার রোধে একটি পরিষ্কার গাইডলাইন দেয়। এর আগেও বিভিন্ন উচ্চ আদালত এবং সুপ্রিম কোর্ট একাধিক রায়ে বলেছে যে, চার দেওয়ালের ভেতরে বা ফোনে হওয়া কোনো ব্যক্তিগত কথোপকথন ‘পাবলিক ভিউ’-এর আওতায় আসে না, তাই তা এই বিশেষ আইনের পরিধিভুক্ত হবে না।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button