
সম্পাদকীয়
ভারতের সুপ্রিম কোর্ট, সাংবিধানিক ব্যাখ্যা ও ন্যায়বিচারের সর্বোচ্চ স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এই শীর্ষ আদালতও আজ মামলার এক বিশাল বোঝায় জর্জরিত। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসের শেষে সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল প্রায় ৮০,২২১। এই সংখ্যাটি কেবল পরিসংখ্যান নয়; এটি লক্ষ লক্ষ নাগরিকের ন্যায়বিচারের অপেক্ষার এক কঠিন বাস্তবতা। এই ‘ব্যাকলগ’ বা মামলার পাহাড়, কেবল বিচার বিভাগের উপর চাপ সৃষ্টি করছে না, বরং সামগ্রিকভাবে ভারতীয় গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের বিশ্বাসকেও প্রভাবিত করছে।
এই মামলার দীর্ঘসূত্রিতার মূল কারণগুলি বহুস্তরীয়। প্রথমত, সুপ্রিম কোর্টের অতিরিক্ত কাজের চাপ (Overburdening)। ভারতের বিচার ব্যবস্থার শীর্ষে অবস্থান করার কারণে এটি কেবল সাংবিধানিক এবং গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় মামলার নিষ্পত্তি করে না, বরং দেশের বিভিন্ন হাইকোর্ট ও নিম্ন আদালতের বিরুদ্ধে আসা ছোটখাটো দেওয়ানি ও ফৌজদারি আপিলগুলিরও শুনানি করে। এই ব্যাপক পরিসরের এখতিয়ারের ফলে প্রতিদিন হাজার হাজার নতুন মামলা (Diary Cases) দ্রুত হারে জমা হতে থাকে।
দ্বিতীয়ত, বিচারপতির সংখ্যার অপ্রতুলতা। যদিও সুপ্রিম কোর্ট সাম্প্রতিককালে তার সম্পূর্ণ শক্তি, অর্থাৎ ৩৪ জন বিচারপতি নিয়ে কাজ করছে, তবুও মামলার বিপুল সংখ্যার তুলনায় এই বিচারপতিদের পক্ষে নিয়মিত হারে নিষ্পত্তি করা কঠিন। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির চেষ্টা সত্ত্বেও, নতুন মামলা দায়েরের হার প্রায়শই নিষ্পত্তির হারকে ছাড়িয়ে যায়।
তৃতীয়ত, ‘জরুরি’ শুনানির সংস্কৃতি। সুপ্রিম কোর্টে কোন মামলাটি দ্রুত শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত হবে, তা নিয়ে একটি বিতর্ক দীর্ঘকাল ধরেই বিদ্যমান। অনেক আইনজীবী এবং সমালোচকের মতে, নির্দিষ্ট কিছু মামলার ক্ষেত্রে দ্রুত শুনানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও, অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ আপিল মামলাগুলি বছরের পর বছর ধরে পড়ে থাকে। এই তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাবও সমস্যার একটি দিক।
চতুর্থত, প্রক্রিয়াগত দীর্ঘসূত্রিতা ও পদ্ধতিগত ত্রুটি। মামলা দায়ের, নথিভুক্তিকরণ এবং শুনানির জন্য প্রস্তুত করতে যে সময় লাগে, তা প্রায়শই দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি করে। বিচারপতি ডি. ওয়াই. চন্দ্রচূড়ের নেতৃত্বে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি আনা হয়েছে, যেমন – ই-ফাইলিং, মামলার অনলাইন ট্র্যাকিং এবং ভার্চুয়াল শুনানি; কিন্তু মামলার তালিকাভুক্তির জটিলতা এবং শুনানিকে সংক্ষিপ্ত করতে না পারার সমস্যা এখনও বড় বাধা।
মামলার এই পাহাড় কেবল ‘তারিখ পে তারিখ’ সংস্কৃতি তৈরি করে না, এটি অর্থনীতির উপরও প্রভাব ফেলে। বাণিজ্যিক বিরোধ এবং দেওয়ানি মামলার দীর্ঘসূত্রিতা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করে এবং দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক চুক্তি সম্পাদনে জটিলতা সৃষ্টি করে। দীর্ঘ বিলম্বের কারণে অনেকে ন্যায়বিচারের আশা হারিয়ে ফেলে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায়, সুপ্রিম কোর্টকে শুধুমাত্র দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির দিকে নজর দিলেই হবে না, বরং কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। এর মধ্যে প্রধান হলো, গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক এবং জাতীয় বিষয়ে মনোযোগ দেওয়ার জন্য সুপ্রিম কোর্টকে আপিল মামলার ভার থেকে আংশিকভাবে মুক্ত করা। এ ছাড়া, উচ্চ আদালতগুলির সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) বা অন্যান্য উন্নত প্রযুক্তিকে বিচার প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করার জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বোঝা কমাতে সামগ্রিক বিচার ব্যবস্থার স্বাস্থ্যোন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি।



