সম্পাদকীয়

একটি গভীর উদ্বেগ: চেক বাউন্স মামলার আইনি জটিলতা

সম্পাদকের দপ্তর

ভারতের বাণিজ্যিক লেনদেনে চেকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বাস ও আস্থার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত এই আর্থিক দলিলটি যখন ‘বাউন্স’ করে, তখন কেবল প্রাপকের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয় না, বরং সামগ্রিক বাণিজ্যিক লেনদেনের বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে পড়ে। এই সমস্যা মোকাবিলার জন্যই ১৮৮১ সালের নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্টস অ্যাক্ট (Negotiable Instruments Act, সংক্ষেপে NI Act)-এর ১৩৮ ধারায় চেক বাউন্সকে একটি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে, যে আইনটি দ্রুত বিচার এবং বাণিজ্যিক আস্থা নিশ্চিত করার জন্য তৈরি হয়েছিল, সেটি নিজেই এখন বিচার বিভাগের উপর এক বিশাল বোঝার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চেক বাউন্স মামলা এখন দেশের আদালতগুলিতে বিচারাধীন থাকা মামলার সংখ্যার একটি বৃহৎ অংশ। এই মামলার সংখ্যা প্রায় ৬০ লক্ষের কাছাকাছি, যা ভারতের বিচার ব্যবস্থার সামগ্রিক বোঝাকে মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে তুলেছে। এই বিশাল সংখ্যাই প্রমাণ করে যে ১৩৮ ধারাটি তার উদ্দেশ্য পূরণে যথেষ্ট সফল হতে পারেনি; বরং এটি এক আইনি জটিলতার জাল তৈরি করেছে।

এই জটিলতার প্রধান কারণগুলি হলো—

প্রথমত, মামলার এখতিয়ার (Jurisdiction) নিয়ে বিভ্রান্তি। অতীতে, চেক জমা দেওয়ার স্থান, টাকা ফেরত আসার স্থান বা আইনি নোটিশ পাঠানোর স্থান—এগুলির মধ্যে যেকোনো একটির এখতিয়ার নিয়ে মামলা দায়ের করা যেত। এর ফলে অসাধু অভিযোগকারীরা দূরবর্তী স্থানে মামলা দায়ের করে অভিযুক্তকে হয়রানি করত। যদিও সুপ্রিম কোর্টের landmark রায় এবং পরবর্তীকালে আইনের সংশোধনী এই বিষয়ে স্পষ্টতা এনেছে যে মামলা কেবল প্রাপকের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট যেখানে রয়েছে, সেই আদালতের এখতিয়ারেই দায়ের করতে হবে, তবুও পুরনো মামলা এবং নতুন আইনি ব্যাখ্যা নিয়ে এখনো কিছুটা ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।

দ্বিতীয়ত, প্রক্রিয়াগত দীর্ঘসূত্রিতা। চেক বাউন্স মামলায় অভিযুক্তের কাছে সমন জারি করাই একটি বড় বাধা। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ঠিকানা পরিবর্তন বা ইচ্ছাকৃতভাবে সমন গ্রহণ না করার কারণে বিচার প্রক্রিয়া মাসের পর মাস, এমনকি বছর ধরে থমকে থাকে। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট ‘ডাস্টি সমন’ (Dasti Summons) বা অভিযোগকারীর মাধ্যমে ব্যক্তিগতভাবে সমন জারির নির্দেশ দিলেও, বাস্তবে বহু মামলা কেবল এই একটি ধাপেই আটকে থাকে।

তৃতীয়ত, আইনের উদ্দেশ্যগত দ্বৈততা এবং অপব্যবহার। ১৩৮ ধারাটি মূলত একটি শাস্তিমূলক (Penal) বিধান, যার উদ্দেশ্য হলো আর্থিক অপরাধের জন্য সাজা নিশ্চিত করা। কিন্তু কার্যত, এই ধারাটি এখন ঋণ পুনরুদ্ধারের (Debt Recovery) একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর ফলে দেওয়ানি প্রকৃতির বিতর্কগুলিও ফৌজদারি আদালতে এসে ভিড় করছে। ঋণ আদায়ের চাপ সৃষ্টি করার জন্য এই ধারার অপব্যবহার নতুন আইনি বিতর্ক সৃষ্টি করছে, বিশেষত যখন কোম্পানিগুলি দেউলিয়া আইন (Insolvency and Bankruptcy Code, IBC) প্রক্রিয়ার অধীনে চলে আসে। এই পরিস্থিতিতে কোম্পানির পরিচালকদের ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা বজায় থাকবে কি না, তা নিয়েও আইনি জটিলতা দেখা দিয়েছে।

চতুর্থত, দ্রুত নিষ্পত্তির অভাব। যদিও ১৩৮ ধারার মামলাগুলিকে সংক্ষিপ্ত বিচার (Summary Trial) পদ্ধতিতে দ্রুত নিষ্পত্তি করার কথা, তবুও সাক্ষ্য, জেরা, এবং আপিলের দীর্ঘ প্রক্রিয়া এর গতিকে মন্থর করে দিয়েছে। এই বিলম্বের কারণে অনেক অভিযুক্তই বিচারের দীর্ঘসূত্রিতাকে কাজে লাগিয়ে তাদের দায়বদ্ধতা এড়ানোর চেষ্টা করে।

সমস্যা সমাধানে সুপ্রিম কোর্ট সাম্প্রতিককালে যে পদক্ষেপগুলি নিয়েছে—যেমন ডেডিকেটেড অনলাইন পেমেন্ট সুবিধা চালু করা বা মামলার সারসংক্ষেপ দাখিলের নির্দেশ—তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে, কেবল প্রক্রিয়াগত পরিবর্তনই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন হলো এই আইনের অধীনে সালিশি (Mediation) প্রক্রিয়াকে বাধ্যতামূলক করা, বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধি করা এবং ১৩৮ ধারাকে কেবল গুরুতর বা বারবার অপরাধের ক্ষেত্রেই কঠোরভাবে প্রয়োগ করা। বাণিজ্যিক লেনদেনে শৃঙ্খলা ও আস্থা ফিরিয়ে আনতে এই আইনি জটিলতার দ্রুত ও কার্যকর সমাধান অপরিহার্য।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button