সম্পাদকীয়

দাগী প্রার্থীরা ও গণতন্ত্রের সংকট: জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের দুর্বলতা

ভারতীয় গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো রাজনীতির ক্রমেই অপরাধীকরণ। অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্মস (ADR)-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের বিরুদ্ধেই গুরুতর ফৌজদারি মামলা বিচারাধীন। এটি আমাদের আইনি কাঠামোর এমন একটি গুরুতর দুর্বলতার দিকে ইঙ্গিত করে, যা দাগী অপরাধীদেরও আইন প্রণয়নের পবিত্র আসনে বসতে দেয়। সেই দুর্বলতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ১৯৫১ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইন (Representation of the People Act, 1951) এবং তার অসম্পূর্ণ ধারাগুলি।

এই আইনের মূল সমস্যা হলো, এটি কেবল “দোষী সাব্যস্ত” (Convicted) হলেই একজন জনপ্রতিনিধিকে নির্বাচনের অযোগ্য ঘোষণা করে। RPA-এর ৮ নম্বর ধারা অনুযায়ী, কেবল তখনই একজন ব্যক্তিকে নির্বাচনের অযোগ্য ঘোষণা করা হয় যখন তিনি দুই বা ততোধিক বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। কিন্তু এই ব্যবস্থাটি “অভিযুক্ত” (Accused) এবং “দোষী সাব্যস্ত” ব্যক্তির মধ্যে একটি বিশাল ফাঁক তৈরি করে দেয়।

ভারতের বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা সুবিদিত। গুরুতর মামলাগুলির নিষ্পত্তি হতে বছরের পর বছর লেগে যায়, এমনকি এক দশকও পার হয়ে যায়। এই দীর্ঘসূত্রিতাই দাগী অপরাধীদের জন্য ফাঁক হিসেবে কাজ করে। অভিযুক্ত ব্যক্তি বছরের পর বছর ধরে তাদের মামলা ঝুলে থাকা সত্ত্বেও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন, নির্বাচনী প্রচারণায় অর্থ ও পেশিশক্তি ব্যবহার করতে পারেন এবং নির্বাচিতও হতে পারেন। আইনটি মূলত বলে, যতক্ষণ না একজন ব্যক্তি চূড়ান্তভাবে দোষী সাব্যস্ত হচ্ছেন, ততক্ষণ তিনি নির্দোষ—এই নীতির সুযোগ নিয়ে একজন অভিযুক্ত আইনসভার সদস্য হিসেবে নিজের বিরুদ্ধে চলা মামলাগুলিতে পরোক্ষভাবে প্রভাব খাটাতে পারেন। এটি শুধু আইনের অপব্যবহার নয়, বরং জনগণের ইচ্ছার সঙ্গে প্রতারণা।

২০১৩ সালের ঐতিহাসিক ‘লিলি থমাস বনাম ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া’ (Lily Thomas vs Union of India) মামলায় সুপ্রিম কোর্ট RPA-এর ৮(৪) উপধারাকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে। এই ধারাটি নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরেও উচ্চ আদালতে আপিল করার জন্য তিন মাসের সময় দিত, যার ফলে তারা পদত্যাগ না করেই পদে বহাল থাকতেন। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে তাৎক্ষণিক অযোগ্যতার ব্যবস্থা হলেও, এটি কেবল “দোষী সাব্যস্ত” প্রতিনিধিদের ক্ষেত্রেই কার্যকর হয়। কিন্তু যাদের বিরুদ্ধে কেবল গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, তাদের নির্বাচনে লড়ার ক্ষেত্রে কোনো বাধা আজও নেই।

গণতন্ত্রের ওপর এই অপরাধীকরণের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। একজন দাগী অপরাধী যখন জনপ্রতিনিধি হন, তখন তিনি আইনসভার পবিত্রতা নষ্ট করেন। তাঁর প্রধান লক্ষ্য থাকে জনগণের সেবা নয়, বরং নিজের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকে আড়াল করা এবং বিচার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করা। এটি সুশাসনের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলির প্রতি জনগণের আস্থা হ্রাস করে এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে ক্ষুণ্ণ করে।

এই সমস্যার সমাধান করতে হলে জনপ্রতিনিধিত্ব আইনে মৌলিক সংস্কার আনা প্রয়োজন। আইন কমিশনের পরামর্শ অনুযায়ী, গুরুতর অপরাধের (যেমন খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, দুর্নীতি) ক্ষেত্রে, চার্জ গঠন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যেন প্রার্থীদের নির্বাচনের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। একইসঙ্গে, রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে বিচারাধীন মামলাগুলির দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত গঠন করা আবশ্যক। আমাদের সংসদকেই উদ্যোগ নিতে হবে এই আইনটি সংশোধনের, যাতে এই দুর্বলতাগুলি দূর হয় এবং “অপরাধীরা আইন তৈরি করবে না”—এই গণতান্ত্রিক আদর্শ বাস্তবে রূপ নেয়। গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে হলে, জনগণের প্রতিনিধিদের অবশ্যই স্বচ্ছ, সৎ এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button