সম্পাদকীয়

সাইবার আতঙ্ক ও ন্যায়বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা: হঠাৎ অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ নিয়ে সাধারণ মানুষের বিপাক

সম্পাদকের দপ্তর

একবিংশ শতাব্দীর ডিজিটাল যুগে, সাইবার অপরাধের কালো ছায়া আজ দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর ভয়াবহভাবে চেপে বসেছে। ‘ফিশিং’ থেকে শুরু করে ‘ভিশিং’, বিভিন্ন প্রতারণামূলক কার্যকলাপের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মানুষ তাঁদের কষ্টার্জিত অর্থ হারাচ্ছেন। তবে এই আর্থিক অপরাধের শিকার হওয়ার চেয়েও বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে এর পরবর্তী প্রশাসনিক প্রক্রিয়া— হঠাৎ করে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ‘ফ্রিজ’ (হিমায়িত) হয়ে যাওয়া। সাইবার ক্রাইম পোর্টালের মাধ্যমে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে নিরপরাধ মানুষও, বিশেষত যারা প্রতারিতদের থেকে স্বল্প সময়ের জন্য অর্থ গ্রহণ করেছেন, তাঁদের অ্যাকাউন্ট অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এটি আর্থিক নিরাপত্তার নামে এক নতুন ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের জন্ম দিয়েছে।

ফ্রিজ প্রক্রিয়ার জটিলতা ও দুর্ভোগ

ভারতের সাইবার ক্রাইম পোর্টাল এবং এর সাথে যুক্ত ‘জাতীয় সাইবার ফরেনসিক ল্যাবরেটরি’র কার্যকারিতা সন্দেহাতীত। কোনো ব্যক্তি প্রতারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অভিযোগ জানালে, পুলিশ বা ব্যাঙ্কগুলি দ্রুত সেই অর্থের গতিপথ অনুসরণ করে। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় প্রায়শই দেখা যায়, প্রতারকের টাকা এমন কোনো অ্যাকাউন্টে গিয়ে পৌঁছায়, যা সেই অপরাধের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়। হতে পারে সেই অ্যাকাউন্টটি নিজেই একজন ভুক্তভোগীর, বা কোনো ছোট ব্যবসায়ী দ্রুত লেনদেনের মাধ্যমে সেই টাকা গ্রহণ করেছেন। আইনগতভাবে, অপরাধমূলক অর্থের গন্তব্য হিসেবে সেই অ্যাকাউন্টটি তাৎক্ষণিক ভাবে ধারা ৪২০ (প্রতারণা) এবং তথ্য প্রযুক্তি আইন (IT Act)-এর বিভিন্ন ধারায় অভিযুক্ত হয়ে ‘ফ্রিজ’ করে দেওয়া হয়।

এই আকস্মিক হিমায়ন সাধারণ মানুষের জীবনে চরম দুর্ভোগ নিয়ে আসে। কোনো পূর্ব সতর্কতা বা যথাযথ শুনানির সুযোগ না পাওয়ায় একজন নিরীহ ব্যক্তির চিকিৎসা, শিক্ষা বা দৈনন্দিন জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যায়। অ্যাকাউন্ট ফ্রিজের পর তা ডি-ফ্রিজ করার প্রক্রিয়া অত্যন্ত দীর্ঘ, জটিল এবং হয়রানিমূলক। দিনের পর দিন সাইবার সেলের কার্যালয়ে ছোটা, আদালতের বারান্দায় ঘোরা এবং আইনি পরামর্শের বিপুল খরচ—এই সব মিলিয়ে ন্যায়বিচারের পথ দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।

উচ্চ আদালতের নির্দেশিকা এবং সুরক্ষার দাবি

এই প্রসঙ্গে দেশের বিভিন্ন হাইকোর্ট, বিশেষত দিল্লি হাইকোর্ট এবং অন্যান্য উচ্চ আদালতগুলি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা দিয়েছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ হলো, সাইবার অপরাধ দমনের নামে নিরপরাধ নাগরিকদের ভোগান্তি চলতে পারে না। প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা (Due Process) এবং দ্রুত নিষ্পত্তির অধিকার (Right to Speedy Justice) সাংবিধানিক অধিকারের মূল অংশ।

হাইকোর্টগুলি বারবার নির্দেশ দিয়েছে যে, অভিযুক্ত পক্ষকে অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার বিষয়ে যথাযথ নোটিশ দিতে হবে এবং ফ্রিজাদেশ যেন নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে পর্যালোচিত হয় (Time-bound Review), তা নিশ্চিত করতে হবে। অনেক রায়ে আদালত পরামর্শ দিয়েছে যে, শুধুমাত্র যে পরিমাণ টাকা সন্দেহজনক লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত, সেই পরিমাণ টাকাই ফ্রিজ করা উচিত। অর্থাৎ, পুরো অ্যাকাউন্ট নয়, বরং নির্দিষ্ট অর্থ ব্লক করার ব্যবস্থা চালু করতে হবে। এছাড়া, যদি অভিযুক্ত পক্ষ প্রমাণ করতে পারে যে তারা সরাসরি অপরাধের সঙ্গে যুক্ত নয়, তবে তাদের জন্য দ্রুত অ্যাকাউন্ট ডি-ফ্রিজের একটি কাঠামো তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।

কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা

এই সমস্যার মোকাবিলায় সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে একটি সর্বজনীন এবং সময়-সীমা নির্ধারিত নির্দেশিকা আসা প্রয়োজন। পুলিশ ও ব্যাঙ্কগুলির সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যে বৈধ উদ্দেশ্য রয়েছে, তার সঙ্গে নাগরিকের দৈনন্দিন জীবনে স্বাভাবিক অধিকারের একটি ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি।

কেবলমাত্র দ্রুত গতিতে অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করাই শেষ কথা নয়; তার চেয়েও বেশি জরুরি হলো দ্রুত ডি-ফ্রিজের জন্য একটি ‘এক-জানলা’ (Single-window) প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠা করা। আইন, প্রশাসন ও বিচার বিভাগ—এই তিন স্তম্ভের যৌথ উদ্যোগেই সম্ভব ডিজিটাল নিরাপত্তার পাশাপাশি নাগরিকের আর্থিক স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের অধিকার নিশ্চিত করা। নতুবা, সাইবার অপরাধীদের দমনের ফলস্বরূপ নিরপরাধ মানুষের ওপর চাপানো এই আইনি বোঝা গণতন্ত্রের আদর্শকে ক্ষুণ্ণ করবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button