ভারতে হেফাজতে মৃত্যু রোধে যুগান্তকারী রায়: ডি. কে. বসু বনাম পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য মামলা এবং সুপ্রিম কোর্টের ১১টি নির্দেশিকা

ভারতের আইনি ইতিহাসে যে কয়েকটি মামলা মৌলিক মানবাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছে, তার মধ্যে ডি. কে. বসু বনাম পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য (1997) মামলাটি অন্যতম। এই মামলাটি পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু, নির্যাতন ও দুর্ব্যবহারের মতো অমানবিক প্রথা রোধে এক ঐতিহাসিক রায় দেয়। সুপ্রিম কোর্ট এই রায়ের মাধ্যমে পুলিশকে কঠোরভাবে অনুসরণ করার জন্য ১১টি বাধ্যতামূলক নির্দেশিকা জারি করেছিল, যা গ্রেফতার এবং আটক সংক্রান্ত প্রক্রিয়াকে চিরতরে বদলে দেয়। এই রায় সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২১ (জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার)-এর সম্মান রক্ষায় বিচার বিভাগের দৃঢ় সংকল্পকে প্রমাণ করে।
মামলার পটভূমি: মানবিকতার আবেদন
এই মামলার উৎপত্তি হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস-এর কার্যনির্বাহী চেয়ারম্যান ডি. কে. বসু-র লেখা একটি চিঠি থেকে। তিনি পুলিশ হেফাজতে ঘটে যাওয়া একাধিক মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা উল্লেখ করে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে চিঠি লেখেন। এই চিঠিটি বিচার বিভাগ মানবতাকে রক্ষা করার জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি জনস্বার্থ মামলা (Public Interest Litigation – PIL) হিসেবে গ্রহণ করে।
বিচারপতি এ. এস. আনন্দ এবং বিচারপতি কে. এস. পারিপুর্ণানাম-এর সমন্বয়ে গঠিত সুপ্রিম কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ মামলাটির শুনানি করে। আদালত স্বীকার করে নেয় যে, পুলিশ হেফাজতে নির্যাতন শুধুমাত্র মানবাধিকারের লঙ্ঘনই নয়, বরং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপর জনগণের বিশ্বাসকেও গুরুতরভাবে ক্ষুণ্ণ করে। আদালত স্পষ্ট ঘোষণা করে যে, একজন ব্যক্তিকে গ্রেফতারের সময় তার অধিকার সুরক্ষিত করা, এবং পুলিশ হেফাজতে থাকাকালীন তার জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের পবিত্র দায়িত্ব।
এই মামলার রায়ে সুপ্রিম কোর্ট হেফাজতে নির্যাতন রোধ এবং গ্রেফতারের পদ্ধতিকে স্বচ্ছ ও মানবিক করার লক্ষ্যে ১১টি বাধ্যতামূলক নির্দেশিকা (11 Mandatory Guidelines) জারি করে। এই নির্দেশিকাগুলি ভারতের প্রতিটি রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের পুলিশ প্রশাসনকে কঠোরভাবে অনুসরণ করার জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল।
সুপ্রিম কোর্টের জারি করা ১১টি নির্দেশিকা
ডি. কে. বসু মামলায় জারি করা ১১টি নির্দেশিকা নিম্নে সহজ সরল ভাষায় ব্যাখ্যা করা হলো:
১. গ্রেফতারকারী অফিসারের পরিচয় (Identity of Officer)
গ্রেফতারকারী দলের প্রত্যেক সদস্যের নামের ট্যাগ স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হতে হবে। তাদের নাম ও পদবি পরিষ্কারভাবে চিহ্নিত থাকতে হবে। এছাড়াও, যে কর্মকর্তা গ্রেফতার করছেন তার বিস্তারিত তথ্য (নাম, পদবি) এবং যে থানায় তিনি নিযুক্ত, তার বিবরণ একটি রেজিস্টারে নথিভুক্ত করতে হবে।
২. গ্রেফতার মেমো তৈরি (Arrest Memo)
গ্রেফতারের সময় একটি গ্রেফতার মেমো (Memo of Arrest) তৈরি করা বাধ্যতামূলক। এই মেমোতে অবশ্যই নিম্নলিখিত বিষয়গুলি উল্লেখ থাকতে হবে:
-
গ্রেফতারের সময় ও তারিখ।
-
মেমোতে গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তির পরিবারের সদস্য বা এলাকার কোনো সম্মানিত ব্যক্তির স্বাক্ষর থাকতে হবে।
-
মেমোতে গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিরও প্রতিস্বাক্ষর (Counter-signature) নিতে হবে।
৩. পছন্দের ব্যক্তিকে অবগত করা (Informing Family/Friend)
গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তির তার একজন আত্মীয়, বন্ধু বা শুভাকাঙ্ক্ষীকে গ্রেফতারের বিষয়ে অবগত করার অধিকার থাকবে। এটি গ্রেফতারের পরপরই করতে হবে।
৪. পুলিশ ডায়েরিতে এন্ট্রি (Entry in Diary)
গ্রেফতারের স্থান, সময় এবং হেফাজতে থাকা ব্যক্তির নাম পুলিশ স্টেশন ডায়েরিতে সঠিকভাবে নথিভুক্ত করতে হবে।
৫. আত্মীয়কে জানানো (Informing Next of Kin)
যদি গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তির আত্মীয় বা বন্ধু গ্রেফতারের জেলার বাইরে থাকেন, তবে তাকে গ্রেফতারের ১২ ঘন্টার মধ্যে টেলিগ্রাম, পোস্ট বা ফোনের মাধ্যমে জানানো বাধ্যতামূলক।
৬. শারীরিক পরীক্ষার মেমো (Inspection Memo)
গ্রেফতারের সময় গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তির শরীরে যদি বড় বা ছোট কোনো আঘাত থাকে, তবে তা নথিভুক্ত করে একটি পরিদর্শন মেমো (Inspection Memo) তৈরি করতে হবে। এই মেমোতে গ্রেফতারকারী অফিসার এবং গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তি—উভয়ের স্বাক্ষর থাকবে। এর একটি কপি গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিকে দিতে হবে।
৭. নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা (Medical Examination)
হেফাজতে থাকাকালীন প্রতি ৪৮ ঘন্টা অন্তর একজন নিবন্ধিত চিকিৎসকের দ্বারা গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা বাধ্যতামূলক। এর রেকর্ডও যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে হবে।
৮. নথি প্রেরণ (Forwarding Documents)
গ্রেফতারের সমস্ত নথি, যার মধ্যে গ্রেফতার মেমো এবং শারীরিক পরীক্ষার মেমো রয়েছে, দ্রুত ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রেরণ করতে হবে।
৯. আইনজীবীর সাথে দেখা করার অধিকার (Right to meet Lawyer)
জিজ্ঞাসাবাদের সময় গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তির তার পছন্দের আইনজীবীর সঙ্গে দেখা করার অনুমতি থাকবে। তবে এটি পুরো জিজ্ঞাসাবাদ জুড়ে থাকার প্রয়োজন নেই।
১০. হাইকোর্টের নির্দেশিকা প্রদর্শন (Display of Guidelines)
গ্রেফতারের এই সমস্ত নির্দেশিকা প্রতিটি থানা, পুলিশ কন্ট্রোল রুম এবং তদন্তকারী কেন্দ্রে স্পষ্টভাবে হিন্দি, ইংরেজি এবং স্থানীয় ভাষায় প্রদর্শন করা বাধ্যতামূলক।
১১. নিয়ম ভঙ্গ হলে শাস্তি (Consequences of Breach)
যদি কোনো পুলিশ অফিসার সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশিকাগুলি লঙ্ঘন করেন, তবে তাকে শুধুমাত্র বিভাগীয় শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে না, পাশাপাশি আদালত অবমাননা (Contempt of Court)-এর জন্যও দায়ী করা যেতে পারে।
তাৎপর্য ও প্রভাব
ডি. কে. বসু মামলায় জারি করা এই নির্দেশিকাগুলি কেবল বিচারিক নির্দেশ ছিল না, বরং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য একটি মৌলিক আইন হিসেবে কাজ করেছে। এই রায়ের ফলস্বরূপ, পরবর্তীতে ফৌজদারি কার্যবিধি (Code of Criminal Procedure – CrPC)-তে বেশ কিছু সংশোধনী আনা হয়, যার মাধ্যমে এই নির্দেশিকাগুলির অনেক অংশকে আইনি ধারায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যেমন CrPC-এর ধারা ৪১(বি), ৪১(সি) এবং ৪১(ডি)।
এই মামলাটি ভারতীয় নাগরিকদের উপর জোর করে ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ক্ষমতার লাগাম টেনে ধরেছে এবং প্রমাণ করেছে যে, পুলিশ হেফাজতে থাকা একজন ব্যক্তিরও সম্মান ও স্বাধীনতা নিয়ে বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার রয়েছে।



