হাইকোর্ট

শিশুকে যৌনাঙ্গ স্পর্শে বাধ্য করা ‘গুরুতর যৌন নিগ্রহ’: দিল্লি হাইকোর্টের যুগান্তকারী রায়

সম্প্রতি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রায়ে দিল্লি হাইকোর্ট স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, কোনো শিশুকে যৌন উদ্দেশ্য নিয়ে নিজের বা অন্য কারো যৌনাঙ্গ স্পর্শ করতে বাধ্য করা একটি ভয়াবহ অপরাধ। আদালত এই ধরনের কাজকে ‘পকসো’ (POCSO) আইনের আওতায় ‘গুরুতর যৌন নিগ্রহ’ (Aggravated Sexual Assault) হিসেবে গণ্য করেছে।

ঘটনার প্রেক্ষাপট

মামলাটি ২০২২ সালের। ঘটনার কেন্দ্রে ছিল মাত্র ৩ বছর বয়সী এক শিশু। শিশুটির মা অভিযোগ করেছিলেন যে, তাঁদের বাড়িতে থাকা এক ভাড়াটে ব্যক্তি তাঁর সন্তানের সামনে নিজের যৌনাঙ্গ উন্মুক্ত করে এবং শিশুটিকে সেটি স্পর্শ করতে বাধ্য করে। এই জঘন্য ঘটনার পর শিশুটির মায়ের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ এফআইআর (FIR) দায়ের করে এবং আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়।

ট্রায়াল কোর্টের রায় ও চ্যালেঞ্জ

প্রাথমিকভাবে নিম্ন আদালত বা ট্রায়াল কোর্ট অভিযুক্ত ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করে এবং পকসো আইনের নির্দিষ্ট ধারা অনুযায়ী তাকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করে। অভিযুক্ত ব্যক্তি এই সাজাকে চ্যালেঞ্জ করে দিল্লি হাইকোর্টে আপিল করেন। তাঁর দাবি ছিল, শিশুটির বয়ানে কিছু অসঙ্গতি রয়েছে এবং ঘটনাটি সাজানো হতে পারে।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্ত

বিচারপতি নিণা বান্সাল কৃষ্ণার একক বেঞ্চে মামলাটির শুনানি হয়। হাইকোর্ট ট্রায়াল কোর্টের রায় বহাল রেখে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দেয়:

১. অপরাধের সংজ্ঞা: আদালত স্পষ্ট করে দেয় যে, শিশুকে দিয়ে জোরপূর্বক যৌনাঙ্গ স্পর্শ করানো সাধারণ যৌন হেনস্থা নয়, বরং এটি POCSO আইনের ১০ নম্বর ধারা অনুযায়ী ‘গুরুতর যৌন নিগ্রহ’।

২. শিশুর বয়ান: আদালত বলে, ভুক্তভোগী শিশুটি অত্যন্ত ছোট (৩ বছর)। এত কম বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে বয়ানে বা কথাবার্তায় সামান্য পার্থক্য থাকা খুবই স্বাভাবিক। ভাষাগত সীমাবদ্ধতার কারণে শিশুটি হয়তো হুবহু একই শব্দ বারবার বলতে পারেনি, কিন্তু তার মানে এই নয় যে তার অভিযোগ মিথ্যা। সামান্য অমিল থাকলেই কোনো শিশুর জবানবন্দিকে অবিশ্বাস করা যাবে না।

৩. আইনি খুঁটিনাটি: তবে হাইকোর্ট টেকনিক্যাল কারণে আইপিসি-এর (IPC) কিছু ধারায় দেওয়া সাজা বাতিল করেছে। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, ট্রায়াল কোর্টে চার্জ গঠনের সময় ওই ধারাগুলো সঠিকভাবে উল্লেখ করা হয়নি। কিন্তু পকসো আইনের অধীনে মূল সাজা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

কেন এই রায় গুরুত্বপূর্ণ?

ভারতে শিশুদের ওপর হওয়া যৌন অপরাধ দমনে ২০১২ সালে ‘প্রটেকশন অফ চিলড্রেন ফ্রম সেক্সুয়াল অফেন্সেস’ বা পকসো আইন তৈরি করা হয়। এই রায়টি পুনরায় প্রমাণ করল যে, শিশুদের নিরাপত্তা এবং তাদের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখতে আইন অত্যন্ত কঠোর। বিশেষ করে ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে আইনি লড়াইয়ে তাদের বয়ানের সত্যতাকে গুরুত্ব দেওয়ার যে নজির আদালত স্থাপন করল, তা আগামী দিনের বিচারপ্রক্রিয়ায় সহায়ক হবে।

সহজ কথায়, শিশুদের ওপর যেকোনো ধরনের যৌন বিকৃতি বা জবরদস্তি আইনত ক্ষমার অযোগ্য এবং এর জন্য দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button