
কর্ণাটক হাইকোর্ট সম্প্রতি একটি অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলায় অভিযুক্ত স্বামীকে বেকসুর খালাস দিয়েছে। ২০১৪ সালের ওই ঘটনায় এক ব্যক্তিকে তার স্ত্রীকে নৃশংসভাবে হত্যা ও দেহ বিকৃত করার অভিযোগে নিম্ন আদালত যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিল। কিন্তু হাইকোর্ট সেই রায় বাতিল করে জানিয়েছে, শুধুমাত্র সন্দেহের বশে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। পরিস্থিতিগত প্রমাণ বা ‘সারকামস্ট্যানশিয়াল এভিডেন্স’-এর শিকল সম্পূর্ণ না হওয়ায় আদালত অভিযুক্ত স্বামীকে ‘বেনিফিট অফ ডাউট’ বা সন্দেহের সুবিধা দিয়ে মুক্তি দিয়েছে।
ঘটনার ভয়াবহ পটভূমি
ঘটনাটি ঘটেছিল আজ থেকে প্রায় এক দশক আগে, ২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাসে। বেঙ্গালুরুর বারিগাঁও এলাকার একটি নির্জন কৃষিজমিতে এক মহিলার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। দেহটির অবস্থা এতটাই ভয়াবহ ও ক্ষতবিক্ষত ছিল যে, প্রাথমিকভাবে সেটি শনাক্ত করাই পুলিশের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছিল, মৃতদেহের গলা ধারালো অস্ত্র দিয়ে কাটা ছিল। শুধু তাই নয়, শরীরের বেশ কিছু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে ফেলা হয়েছিল এবং শরীর থেকে চামড়া ছাড়িয়ে নেওয়া হয়েছিল। হত্যাকারীর উদ্দেশ্য ছিল যাতে মৃতদেহটি চেনা না যায় এবং প্রমাণের লোপাট করা যায়। পরবর্তীতে জানা যায়, মৃত ওই মহিলার নাম রাম্যা।
ফেসবুক পোস্ট ও হত্যার অভিযোগ
তদন্তে নেমে পুলিশ রাম্যার স্বামী অরুন কুমারকে প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করে। পুলিশের অভিযোগপত্রে বলা হয়েছিল, এই হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ ছিল দাম্পত্য কলহ এবং একটি ফেসবুক পোস্ট।
অভিযোগ অনুযায়ী, অরুন কুমারের বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক রয়েছে বলে সন্দেহ করতেন রাম্যা। এই নিয়ে তিনি ফেসবুকে একটি পোস্ট শেয়ার করেছিলেন, যেখানে অরুন এবং তার কথিত প্রেমিকা সম্পর্কে কিছু অসম্মানজনক মন্তব্য করা হয়েছিল। পুলিশের দাবি ছিল, এই ফেসবুক পোস্টটি দেখার পরেই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে চরম বিবাদ শুরু হয়, যার পরিণতিতে অরুন তার স্ত্রীকে নির্মমভাবে হত্যা করেন এবং প্রমাণ মেটাতে দেহটি বিকৃত করে দেন।
নিম্ন আদালতের রায় বনাম হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ
পুলিশি তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার প্রক্রিয়া চলার পর, ২০২৪ সালে নিম্ন আদালত অরুন কুমারকে স্ত্রী হত্যা, নিষ্ঠুরতা এবং প্রমাণ লোপাটের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে। আদালত তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দেয়।
তবে অরুন কুমার এই রায়ের বিরুদ্ধে কর্ণাটক হাইকোর্টে আপিল করেন। হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ মামলার সমস্ত নথিপত্র এবং প্রমাণ খুঁটিয়ে দেখার পর ভিন্ন রায় প্রদান করে। হাইকোর্ট তার পর্যবেক্ষণে জানায়, এই মামলাটি পুরোপুরি পরিস্থিতিগত প্রমাণের (Circumstantial Evidence) ওপর দাঁড়িয়ে আছে। প্রত্যক্ষ কোনো সাক্ষী নেই।
আদালত স্পষ্ট করে বলে, পরিস্থিতিগত প্রমাণের ক্ষেত্রে ঘটনার একটি অটুট শিকল বা চেইন তৈরি হওয়া জরুরি, যা নিঃসন্দেহে প্রমাণ করবে যে অভিযুক্তই অপরাধী। কিন্তু এই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ সেই শিকল সম্পূর্ণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। শুধুমাত্র জটিল পরিস্থিতি বা সন্দেহের ওপর ভিত্তি করে কাউকে হত্যা মামলায় দোষী সাব্যস্ত করা আইনত সিদ্ধ নয়।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
হাইকোর্ট তার রায়ে উল্লেখ করেছে, অপরাধ যতই নৃশংস হোক না কেন, প্রমাণের অভাব থাকলে অভিযুক্তকে শাস্তি দেওয়া যায় না। যেহেতু অরুন কুমারের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করা যায়নি, তাই আদালত তাকে খালাস দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলে, নিম্ন আদালতের দেওয়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বাতিল হয়ে যায় এবং অরুন কুমার মুক্তি পান।



