
ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের যুগে ইউটিউব ভিডিওতে কপিরাইট সংক্রান্ত জটিলতা এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি টিভি৯ (TV9) নেটওয়ার্কের ইউটিউব ভিডিওর বিরুদ্ধে বিদেশি সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর পাঠানো কপিরাইট স্ট্রাইককে “ভিত্তিহীন” বলে আখ্যা দিয়েছে দিল্লি হাইকোর্ট। আদালতের মতে, সংবাদ পরিবেশনের স্বার্থে ব্যবহৃত ছোট ভিডিও ক্লিপ অনেক ক্ষেত্রেই ‘ফেয়ার ইউজ’ (Fair Use) বা ন্যায্য ব্যবহারের আওতায় পড়ে।
মামলার প্রেক্ষাপট: আন্তর্জাতিক সংঘাত ও কপিরাইট যুদ্ধ
টিভি৯ নেটওয়ার্ক আদালতের দ্বারস্থ হয়ে অভিযোগ করে যে, বেশ কয়েকজন বিদেশি সাংবাদিক এবং আন্তর্জাতিক মিডিয়া হাউজ তাদের ইউটিউব চ্যানেলের ভিডিওগুলোর বিরুদ্ধে বারবার কপিরাইট লঙ্ঘনের নোটিস পাঠাচ্ছে। এর ফলে ইউটিউব কর্তৃপক্ষ তাদের ভিডিওগুলো সরিয়ে দিচ্ছে, যা চ্যানেলের অস্তিত্বের ওপর বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে।
ইউটিউবের নিয়ম অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তিনটি ‘কপিরাইট স্ট্রাইক’ এলে একটি চ্যানেল স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। টিভি৯-এর দাবি, তারা বিশ্বজুড়ে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সংবাদ প্রচারের জন্য সীমিত পরিসরে ফুটেজ ব্যবহার করেছিল। এর মধ্যে ছিল:
-
যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানা হারিকেন লরা, তুষারঝড় ও বন্যার ফুটেজ।
-
ইসরায়েল-হামাস সংঘর্ষের দৃশ্য।
-
২০২৩ সালের বহুল আলোচিত চীনা নজরদারি বেলুন সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক খবরের ক্লিপ।
আদালতের পর্যবেক্ষণ: ‘ফেয়ার ডিলিং’ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা
মামলাটি শুনছিলেন বিচারপতি তেজস কারিয়া। তিনি প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে জানান যে, ভারতীয় কপিরাইট আইন, ১৯৫৭ অনুযায়ী সংবাদ প্রতিবেদন, সমালোচনা বা পর্যালোচনার উদ্দেশ্যে কোনো উপাদানের সীমিত ব্যবহার ‘ফেয়ার ডিলিং’ হিসেবে স্বীকৃত।
আদালত স্পষ্ট করে দেয় যে: ১. সংবাদ পরিবেশনের জন্য ছোট ভিডিও ক্লিপ ব্যবহার করা কপিরাইট আইনের লঙ্ঘন নয়, বরং এটি সংবাদমাধ্যমের কাজের একটি অপরিহার্য অংশ। ২. ভিত্তিহীনভাবে কপিরাইট স্ট্রাইক পাঠিয়ে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা গ্রহণযোগ্য নয়।
হাইকোর্টের অন্তর্বর্তী নির্দেশ
বিচারপতি তেজস কারিয়া অভিযুক্ত বিদেশি সাংবাদিক ও সংস্থাগুলিকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তাঁরা আপাতত টিভি৯-এর ভিডিওগুলির বিরুদ্ধে আর কোনও “ভিত্তিহীন কপিরাইট হুমকি” বা স্ট্রাইক পাঠাতে পারবেন না। আদালতের এই অন্তর্বর্তী নির্দেশের ফলে টিভি৯-এর ইউটিউব চ্যানেলগুলো সাময়িকভাবে বড় ধরনের আইনি ও প্রযুক্তিগত বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেল।
আদালত মনে করে, স্রেফ ভিডিওর মালিকানা দাবি করে জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট সংবাদ প্রচারে বাধা দেওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে যখন ফুটেজগুলো সংবাদকে পূর্ণতা দেওয়ার জন্য ন্যূনতম পরিমাণে ব্যবহার করা হয়।
গুরুত্ব ও প্রভাব
দিল্লি হাইকোর্টের এই রায় ভারতের ডিজিটাল মিডিয়া জগতের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অনেক সময় বড় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কপিরাইট আইনকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে ছোট বা আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করে। এই নির্দেশের ফলে ‘ফেয়ার ইউজ’ নীতির গুরুত্ব পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হলো। মামলার পরবর্তী শুনানিতে কপিরাইট এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার এই ভারসাম্য নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা হবে।



