খবরাখবর

দিল্লি দাঙ্গা মামলা: কেন উমর খালিদ ও শারজিল ইমামের জামিন মঞ্জুর করল না সুপ্রিম কোর্ট?

২০২০ সালের উত্তর-পূর্ব দিল্লি দাঙ্গার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে অভিযুক্ত দুই প্রধান মুখ উমর খালিদ এবং শারজিল ইমামের জামিনের আবেদন নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্ক ও আলোচনা দীর্ঘদিনের। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট এবং উচ্চতর আদালতগুলোর বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে ঠিক কী কারণে তাঁদের দীর্ঘ সময় ধরে কারাবন্দি থাকতে হচ্ছে। আইনি জটিলতা এবং গুরুতর অভিযোগের ভিত্তিতে আদালত তাঁদের জামিন দিতে অসম্মতি প্রকাশ করেছে।

মামলার প্রেক্ষাপট

২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (CAA) এবং জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (NRC) বিরোধী আন্দোলনের সময় উত্তর-পূর্ব দিল্লিতে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। এই দাঙ্গায় ৫৩ জন প্রাণ হারান এবং শত শত মানুষ আহত হন। দিল্লি পুলিশ অভিযোগ করে যে, এই দাঙ্গা কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না, বরং এটি ছিল ভারত সরকারকে অস্থিতিশীল করার একটি পরিকল্পিত বৃহত্তর ষড়যন্ত্র। এই ষড়যন্ত্রে যুক্ত থাকার অভিযোগে উমর খালিদ এবং শারজিল ইমামের বিরুদ্ধে কড়া সন্ত্রাসবিরোধী আইন ইউএপিএ (UAPA)-এর অধীনে মামলা দায়ের করা হয়।


জামিন নাকচ হওয়ার প্রধান কারণসমূহ

১. বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অভিযোগ (Deep-rooted Conspiracy): আদালতের মতে, পুলিশ যে চার্জশিট দাখিল করেছে তাতে প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয় যে, অভিযুক্তরা দিল্লির বিভিন্ন জায়গায় ‘চাক্কা জ্যাম’ এবং বিক্ষোভের আড়ালে সহিংসতা উসকে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। আদালত মনে করছে, এই দাঙ্গা ছিল সুপরিকল্পিত এবং এতে অভিযুক্তদের সক্রিয় ভূমিকা ছিল।

২. ইউএপিএ (UAPA) আইনের কঠোরতা: ইউএপিএ আইনের ৪৩-ডি (৫) ধারা অনুযায়ী, যদি আদালতের কাছে মনে হয় যে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো প্রাথমিকভাবে সত্য (Prima Facie True), তবে জামিন দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। উমর খালিদ ও শারজিল ইমামের ক্ষেত্রে পুলিশি তথ্যপ্রমাণ এবং হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট রেকর্ড দেখে আদালত মনে করেছে যে, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন নয়।

৩. উসকানিমূলক বক্তৃতা: শারজিল ইমামের বিরুদ্ধে ভারতের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হানার মতো বক্তৃতার অভিযোগ রয়েছে। তাঁর দেওয়া ভাষণে ‘আসামকে ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করার’ মতো বিতর্কিত মন্তব্যের উল্লেখ করেছে প্রসিকিউশন। আদালত মনে করছে, এই ধরনের বক্তৃতা দাঙ্গা ছড়াতে বারুদের কাজ করেছে।

৪. সাক্ষী ও তথ্যের নিরাপত্তা: আদালতের পক্ষ থেকে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে, এই পর্যায়ে তাঁদের মুক্তি দিলে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের ওপর প্রভাব খাটানো হতে পারে বা প্রমাণের কারচুপি হতে পারে। ষড়যন্ত্রের জাল অনেক দূর বিস্তৃত হওয়ায় তদন্তের স্বার্থে তাঁদের হেফাজতে রাখা প্রয়োজন বলে মনে করেছে আদালত।


আদালতের পর্যবেক্ষণ

সুপ্রিম কোর্ট এবং দিল্লি হাইকোর্ট বিভিন্ন শুনানিতে জানিয়েছে যে, প্রতিবাদের অধিকার একটি গণতান্ত্রিক অধিকার, কিন্তু সেই অধিকারের আড়ালে সহিংসতা বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা সহ্য করা যায় না। যদিও উমর খালিদের আইনজীবীরা বারবার দাবি করেছেন যে, কোনো সরাসরি সহিংসতায় খালিদ যুক্ত ছিলেন না, কিন্তু আদালত জানিয়েছে, ষড়যন্ত্রের অংশ হওয়াটাও আইনের চোখে সমান অপরাধ।

উপসংহার

বর্তমানে উমর খালিদ এবং শারজিল ইমাম বিচার বিভাগীয় হেফাজতে রয়েছেন। এই মামলার পরবর্তী বিচারপ্রক্রিয়া এবং নতুন তথ্যপ্রমাণের ওপর ভিত্তি করে তাঁদের আইনি ভাগ্য নির্ধারিত হবে। তবে আপাতত, ইউএপিএ আইনের কঠোরতা এবং পুলিশের দেওয়া প্রাথমিক প্রমাণের ভারেই তাঁদের জামিনের পথ রুদ্ধ হয়ে আছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button