আইনশিক্ষা

গার্হস্থ্য হিংসার শিকার হলে নারীর আইনি সুরক্ষা: সুরক্ষা আদেশ থেকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ— জেনে নিন আইন ও আদালতের ক্ষমতা

ভারতে গার্হস্থ্য হিংসার (Domestic Violence) শিকার হওয়া একজন নারীর জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী আইনি অস্ত্র হলো ‘গার্হস্থ্য হিংসা থেকে মহিলাদের সুরক্ষা আইন, ২০০৫’ (The Protection of Women from Domestic Violence Act, 2005 – PWDVA)। এটি একটি দেওয়ানি আইন হলেও, এর অধীনে দ্রুত এবং কার্যকর প্রতিকার পাওয়া যায়। এই আইনটি সকল ধর্ম ও সমাজের নারীদের জন্য প্রযোজ্য, যার মধ্যে মুসলিম মহিলারাও অন্তর্ভুক্ত। এই আইনের বিধানগুলির ওপরেই সুপ্রিম কোর্টের রায় ও নির্দেশিকা প্রতিষ্ঠিত।


১. গার্হস্থ্য হিংসা সুরক্ষা আইনের (PWDVA, 2005) অধীনে উপলব্ধ সাহায্য:

গার্হস্থ্য হিংসার শিকার একজন নারী এই আইনের অধীনে সরাসরি বিচার বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদন করে নিম্নলিখিত ৫ ধরনের আদেশ বা প্রতিকার পেতে পারেন:

  • সুরক্ষা আদেশ (Protection Order):

    • আদালত অভিযুক্তকে নির্দেশ দিতে পারে যেন তিনি ভবিষ্যতে আর কোনো ধরনের গার্হস্থ্য হিংসা না করেন, এমনকি হোয়াটসঅ্যাপ বা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমেও না করেন।

    • অভিযুক্তকে শিকারের কর্মস্থল বা স্কুলে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে বলা যেতে পারে।

  • বাসস্থানের আদেশ (Residence Order):

    • এই আদেশের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয় যে, নারী যেন যৌথ গৃহে (Shared Household) শান্তিতে বসবাস করতে পারেন, এমনকি অভিযুক্তের সঙ্গেও।

    • আদালত অভিযুক্তকে ঘর থেকে বা যৌথ বাসস্থানের একটি অংশ থেকে সরিয়ে দিতে পারে, অথবা শিকারকে বিকল্প থাকার ব্যবস্থা (যেমন ভাড়া করা বাড়ি) করে দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারে।

  • আর্থিক ক্ষতিপূরণ আদেশ (Monetary Relief Order):

    • আদালত শিকারের চিকিৎসা খরচ, ভরণপোষণ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচের জন্য অভিযুক্তকে মাসিক অর্থ প্রদানের নির্দেশ দিতে পারে।

    • এই ভরণপোষণের অধিকার অন্যান্য ব্যক্তিগত আইনের (মুসলিম আইনসহ) অধীনে প্রাপ্ত ভরণপোষণের অধিকারের অতিরিক্ত হিসাবে বিবেচিত হয়।

  • ক্ষতিপূরণ আদেশ (Compensation Order):

    • নারী শারীরিক বা মানসিক ক্ষতির জন্য আর্থিক ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারেন।

  • কাস্টডি আদেশ (Custody Order):

    • যদি সন্তানের কাস্টডি নিয়ে বিরোধ থাকে, আদালত সাময়িক সময়ের জন্য নারীর কাছে সন্তানের কাস্টডি দিতে পারে।

২. মুসলিম আইনের ভূমিকা ও সীমাবদ্ধতা:

যদিও মুসলিম পার্সোনাল ল’ (শরিয়ত) অ্যাপ্লিকেশন অ্যাক্ট, ১৯৩৭ বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ এবং ভরণপোষণের মতো বিষয়গুলি নিয়ন্ত্রণ করে, তবুও গার্হস্থ্য হিংসা প্রতিরোধ এবং সুরক্ষার জন্য মুসলিম আইন সরাসরি কোনো প্রতিকার দেয় না

গুরুত্বপূর্ণভাবে, PWDVA, 2005 আইনটি হলো একটি ধর্মনিরপেক্ষ আইন (Secular Law)। তাই মুসলিম মহিলাদের জন্য এটি একটি অতিরিক্ত সুরক্ষা বলয় হিসেবে কাজ করে, যা তাঁদের ব্যক্তিগত আইনের কোনো বিধানকে প্রভাবিত করে না।

৩. সুপ্রিম কোর্টের ল্যান্ডমার্ক রায় ও মূলনীতি:

সুপ্রিম কোর্ট PWDVA আইনকে ব্যাপক এবং কার্যকর করার জন্য একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছে:

  • ভি ডি ভানামালিকা বনাম এম কোয়াইমালিকা (V. D. Bhanumati v. M. Koiymaliaka, 2020):

    • এই রায়ে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেয় যে, গার্হস্থ্য হিংসা আইনের অধীনে স্ত্রী তাঁর শ্বশুরবাড়ির যৌথ গৃহে (Shared Household) থাকার অধিকার হারান না, এমনকি স্বামীর মালিকানাধীন বাড়ি না হলেও। এই আইনের উদ্দেশ্য হলো নারীর সুরক্ষাকে নিশ্চিত করা।

  • হীরালাল হ্যারিসন তিরোনে বনাম মহারাষ্ট্র রাজ্য (Hiralal Harison Tironde v. State of Maharashtra, 2018):

    • এই মামলায় আদালত জানায় যে, PWDVA আইন একটি নাগরিক আইন (Civil Law) হলেও, সুরক্ষা আদেশের লঙ্ঘন হলে তা ফৌজদারি অপরাধ (Criminal Offence) হিসেবে গণ্য হবে এবং সেক্ষেত্রে অভিযুক্তকে এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। এটি আইনটির প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করেছে।

  • তারুণ বাত্রা বনাম জয়তি বাত্রা (Tarun Batra v. Jyoti Batra):

    • এই মামলায় সুপ্রিম কোর্ট প্রথমবার যৌথ বাসস্থানের ধারণাটিকে প্রতিষ্ঠিত করে, যা গার্হস্থ্য হিংসার শিকার নারীর জন্য বাসস্থান সুরক্ষিত করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

উপসংহার:

গার্হস্থ্য হিংসার শিকার হওয়া একজন নারী PWDVA, 2005 আইনের মাধ্যমে সুরক্ষা কর্মকর্তা (Protection Officer) বা সরাসরি বিচার বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদন করে দ্রুত বাসস্থান, আর্থিক সাহায্য এবং কাস্টডিসহ বিভিন্ন ধরনের আইনি প্রতিকার পেতে পারেন। এই আইনটি নারীর সাংবিধানিক মর্যাদা এবং জীবনধারণের অধিকারকে নিশ্চিত করে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button