হাইকোর্ট

ভরণপোষণের মামলায় ব্যভিচারের প্রমাণ: প্রত্যক্ষ প্রমাণ নয়, পারিপার্শ্বিক প্রমাণেই মিলতে পারে মুক্তি – কেরল হাইকোর্টের গুরুত্বপূর্ণ রায়

ভূমিকা ও মামলার প্রেক্ষাপট

ফৌজদারি কার্যবিধির ১২৫ ধারার (Section 125 CrPC) অধীনে ভরণপোষণ সংক্রান্ত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রায়ে কেরল হাইকোর্ট সম্প্রতি জানিয়েছে যে, ভরণপোষণের মামলায় ব্যভিচারের অভিযোগ প্রমাণ করার জন্য প্রত্যক্ষ প্রমাণের (Direct Evidence) প্রয়োজন নেই। পারিপার্শ্বিক বা পরিস্থিতিগত প্রমাণের (Circumstantial Evidence) ভিত্তিতেই ব্যভিচার প্রমাণ করা সম্ভব এবং সেক্ষেত্রে অভিযুক্ত স্ত্রী ভরণপোষণের অধিকার হারাবেন।

মামলাটির শিরোনাম হলো জিনিশ সি.আর. বনাম অস্বাথি পি.আর. (JINESH.C.R. versus ASWATHY.P.R.) (RPFC NO. 100 OF 2023)। একজন স্বামী ফ্যামিলি কোর্টের সেই আদেশকে চ্যালেঞ্জ জানান, যেখানে তাঁকে প্রতি মাসে তাঁর প্রাক্তন স্ত্রীকে ৭,৫০০ টাকা ভরণপোষণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। স্বামীর যুক্তি ছিল, ১২৫(৪) ধারা অনুসারে, যে স্ত্রী “ব্যভিচারে লিপ্ত জীবনযাপন করেন” (living in adultery), তিনি ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকারী নন।

আদালতের পর্যবেক্ষণ ও প্রমাণের মানদণ্ড

বিচারপতি কাউসার ইদাপ্পাগাথ (Justice Kauser Edappagath)-এর বেঞ্চ জোর দিয়ে জানায় যে, ১২৫ ধারার অধীনে ভরণপোষণ সংক্রান্ত মামলাগুলি মূলত দেওয়ানি প্রকৃতির (Civil in nature) হয়ে থাকে। তাই এখানে প্রমাণের মানদণ্ড ফৌজদারি মামলার মতো কঠোর হওয়ার প্রয়োজন নেই। আদালতের মতে, ব্যভিচারের মতো গোপন কাজের ক্ষেত্রে “সম্ভাবনার ভারসাম্যের ভিত্তিতে প্রমাণ” (Proof by preponderance of probabilities)-ই যথেষ্ট।

হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণ করে যে, ১২৫(৪) ধারা অনুসারে অধিকার হারানোর জন্য অভ্যাসগত ব্যভিচারী আচরণ (habitual adulterous behaviour) প্রমাণ করা আবশ্যক, শুধুমাত্র বিচ্ছিন্ন ঘটনা দিয়ে তা প্রমাণ করা যায় না। তবে এই অভ্যাসগত আচরণ প্রমাণ করার জন্য অবশ্যই পারিপার্শ্বিক প্রমাণের উপর নির্ভর করা যেতে পারে।

পারিপার্শ্বিক প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত

মামলার শুনানিতে স্বামী তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ প্রমাণ করতে বেশ কিছু পারিপার্শ্বিক প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করেন। এর মধ্যে ছিল:

১. মনোবিজ্ঞানীর চিকিৎসার নথি, যেখানে স্ত্রীর অবৈধ সম্পর্কের বারবার উল্লেখ পাওয়া যায়। ২. মনোবিজ্ঞানীর রেকর্ডে স্ত্রীর পরকীয়ায় আসক্তির ইঙ্গিত। ৩. ঘটনার সমর্থনকারী সাক্ষীদের বক্তব্য।

আদালত এই সমস্ত পারিপার্শ্বিক প্রমাণগুলি সম্মিলিতভাবে বিবেচনা করে রায় দেয় যে, ব্যভিচারের অভিযোগ প্রমাণিত। আদালত এই মর্মে রায় দেয় যে, একজন মহিলা “ব্যভিচারে জীবনযাপন করছেন কিনা”, তা সংখ্যাগতভাবে (numerically) বিচার করা যায় না, বরং বিষয়টি সামগ্রিকভাবে (holistically) দেখা উচিত।

তাৎপর্য ও উপসংহার

এই পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে হাইকোর্ট ফ্যামিলি কোর্টের ভরণপোষণের আদেশটি বাতিল করে দেয় এবং রায় দেয় যে প্রমাণিত অভ্যাসগত ব্যভিচারের কারণে স্ত্রী ভরণপোষণ পাওয়ার যোগ্য নন। এই রায়টি ১২৫ ধারার মামলাগুলিতে ব্যভিচারের অভিযোগ প্রমাণের ক্ষেত্রে আইনি মানদণ্ডকে আরও যুক্তিসঙ্গত ও বাস্তবসম্মত করেছে এবং বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কে থাকা স্ত্রীদের ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকার সীমিত করেছে।

মামলার রায়

212600001002023_8

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button