ন্যায়তত্ত্ব

প্রাচীন ভারতের জ্ঞানতত্ত্বের ভিত্তি: মহর্ষি গৌতমের ন্যায়দর্শন

প্রাচীন ভারতীয় দর্শনের ছয়টি আস্তিক ধারার (ষড়দর্শন) মধ্যে ‘ন্যায়দর্শন’ হলো যুক্তি এবং জ্ঞানতত্ত্বের এক শক্তিশালী ভিত্তি। এই দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা হলেন মহর্ষি গৌতম, যিনি ‘অক্ষপাদ গৌতম’ নামেও পরিচিত। ন্যায় শব্দের অর্থ হলো ‘যুক্তি’ বা ‘পদ্ধতি’। এই দর্শন জ্ঞান অর্জন এবং ভুল ধারণাকে দূর করার জন্য একটি সুসংগঠিত পদ্ধতির প্রস্তাব করে, যার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো মোক্ষ বা দুঃখমুক্তি লাভ করা।

মোক্ষ এবং ষোড়শ পদার্থ

গৌতমের ন্যায় দর্শনের মূল লক্ষ্য হলো আত্মার চরম মুক্তি (অপবর্গ বা মোক্ষ) অর্জন করা। ন্যায় মতে, মোক্ষ লাভ সম্ভব কেবল ১৬টি নির্দিষ্ট ‘পদার্থ’ বা বর্গ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে। এই ষোড়শ পদার্থগুলি হলো— প্রমাণ, প্রমেয়, সংশয়, প্রয়োজন, দৃষ্টান্ত, সিদ্ধান্ত, অবয়ব, তর্ক, নির্ণয়, বাদ, জল্প, বিতণ্ডা, হেত্বাভাস, ছল, জাতি এবং নিগ্রহস্থান। এই বর্গগুলির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রমাণ (Means of Valid Knowledge) এবং প্রমেয় (Objects of Knowledge)

প্রমা ও প্রমাণের ধারণা

ন্যায় দর্শনে সঠিক জ্ঞানকে ‘প্রমা’ বলা হয়। প্রমা অর্জনের জন্য গৌতম চারটি প্রধান প্রমাণ বা উৎসকে স্বীকার করেছেন। এই চারটি প্রমাণ হলো:

১. প্রত্যক্ষ (Perception): এটি হলো ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে সরাসরি প্রাপ্ত জ্ঞান। চোখ, কান, ত্বক, জিভ এবং নাকের সঙ্গে বস্তুর সংযোগের ফলে যে জ্ঞান জন্মায়, তাই প্রত্যক্ষ। ন্যায় মতে, প্রত্যক্ষকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়— লৌকিক (সাধারণ) এবং অলৌকিক (অসাধারণ)।

২. অনুমান (Inference): এটি হলো ন্যায় দর্শনের প্রাণকেন্দ্র। জ্ঞাত তথ্যের ভিত্তিতে কোনো অজ্ঞাত বিষয়ে পৌঁছানোই হলো অনুমান। যেমন, পাহাড়ে ধোঁয়া দেখে সেখানে আগুন থাকার সিদ্ধান্তে আসা। অনুমানকে তিন প্রকারে বিভক্ত করা হয়: পূর্ববৎ (কারণ থেকে কার্য), শেষবৎ (কার্য থেকে কারণ) এবং সামান্যতোদৃষ্ট (সাদৃশ্য বা সাধারণ অভিজ্ঞতা থেকে)।

৩. উপমান (Comparison): উপমান হলো সাদৃশ্যের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন। কোনো পরিচিত বস্তুর সঙ্গে তুলনা করে যখন কোনো অপরিচিত বস্তুর জ্ঞান লাভ করা হয়, তখন তাকে উপমান বলে। যেমন, “বুনো গরুর মতো দেখতেই হলো গবয়।”

৪. শব্দ (Verbal Testimony): বিশ্বস্ত ব্যক্তি বা শাস্ত্রের বাক্য থেকে প্রাপ্ত জ্ঞানকে শব্দ প্রমাণ বলা হয়। ন্যায় মতে, যে ব্যক্তি সত্য বলেন এবং যাঁর জ্ঞান নির্ভুল, তাঁর বক্তব্যই কেবল বৈধ প্রমাণের মর্যাদা পায়।

অনুমানের পাঁচ-অবয়বী বাক্য (Panchavayava Vakya)

গৌতমের ন্যায়তত্ত্বের সবচেয়ে বড় অবদান হলো তার সুসংগঠিত অনুমান প্রক্রিয়া, যা ‘পঞ্চ-অবয়বী বাক্য’ বা পাঁচ-ধাপের ন্যায়-পদ্ধতি নামে পরিচিত। কোনো বিতর্কে বা যুক্তির সঠিকতা প্রমাণ করতে এই পাঁচটি ধাপ অপরিহার্য:

১. প্রতিজ্ঞা (Proposition): মূল বক্তব্য বা সিদ্ধান্তের সূচনা। (উদাহরণ: পাহাড়ে আগুন আছে)। ২. হেতু (Reason): প্রতিজ্ঞার স্বপক্ষে কারণ দেখানো। (উদাহরণ: কারণ সেখানে ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে)। ৩. উদাহরণ (Illustration): কারণ ও ফলাফলের মধ্যে অনিবার্য সম্পর্কটি উদাহরণসহ স্থাপন করা। (উদাহরণ: যেখানেই ধোঁয়া থাকে, সেখানেই আগুন থাকে, যেমন রান্নাঘর)। ৪. উপনয় (Application): উদাহরণকে বর্তমান ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা। (উদাহরণ: এই পাহাড়টিও সেইরকম ধোঁয়াযুক্ত)। ৫. নিগমন (Conclusion): প্রথম ধাপের সিদ্ধান্তকে পুনর্বার প্রতিষ্ঠা করা। (উদাহরণ: অতএব, পাহাড়ে আগুন আছে)।

ন্যায়তত্ত্বের প্রভাব

ন্যায়দর্শনকে ভারতীয় যুক্তিবিদ্যার ভিত্তি বলা হয়। এর বিশ্লেষণাত্মক পদ্ধতি এবং কঠোর জ্ঞানতত্ত্ব কেবল পরবর্তী দার্শনিক ধারাগুলিকেই প্রভাবিত করেনি, বরং ভারতের বিভিন্ন শাস্ত্রীয় আলোচনা, বিতর্ক এবং আইনি প্রক্রিয়াতেও এর ছাপ সুস্পষ্ট। ন্যায়তত্ত্ব আমাদের শেখায় যে, যুক্তি, পর্যবেক্ষণ এবং প্রমাণের মাধ্যমেই আমরা সত্যকে জানতে পারি এবং এই জ্ঞানই দুঃখের চিরকালীন অবসান ঘটাতে পারে। ফলস্বরূপ, গৌতমের এই দর্শন কেবল প্রাচীন ভারতের এক বৌদ্ধিক সম্পদই নয়, বরং মানব জ্ঞানের অনুসন্ধানের ইতিহাসে এক চিরন্তন আলোকবর্তিকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button