
ভূমিকা
ভারতীয় সংবিধান, যা ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি কার্যকর হয়, বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিত্তি। এই সংবিধান শুধুমাত্র রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়মাবলী নয়, বরং এটি একটি সামাজিক দলিল যা গণতন্ত্র, ন্যায়, স্বাধীনতা ও সাম্য প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার বহন করে। ডঃ বি. আর. আম্বেদকর-এর নেতৃত্বাধীন খসড়া কমিটি দ্বারা প্রণীত এই সংবিধান রাষ্ট্রের তিনটি প্রধান অঙ্গের মধ্যে ক্ষমতার সুস্পষ্ট বিভাজন নিশ্চিত করেছে, যা ভারতীয় গণতন্ত্রের স্থিতিশীলতা ও কার্যকারিতার মূল ভিত্তি।
ক্ষমতার বিভাজন: একটি অপরিহার্য নীতি
আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো ক্ষমতার বিভাজন (Separation of Powers)। ফরাসি দার্শনিক মঁতেস্কু (Montesquieu)-এর ধারণা থেকে উদ্ভূত এই নীতিটি নিশ্চিত করে যে রাষ্ট্রের সমস্ত ক্ষমতা যেন কোনো একটি ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত না হয়। এটি ক্ষমতাকে তিনটি প্রধান স্তম্ভের মধ্যে বিভক্ত করে: আইনসভা, কার্যনির্বাহী বিভাগ এবং বিচার বিভাগ।
ভারতে, সংবিধান এই তিনটি বিভাগের ভূমিকা ও ক্ষমতা স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে, যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো কঠোর বিভাজন নীতি অনুসরণ না করে বরং ‘নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য’ (Checks and Balances) নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।
শাসন ব্যবস্থার তিনটি স্তম্ভ
ভারতীয় সংবিধানের অধীনে, সরকার নিম্নলিখিত তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে:
১. আইনসভা (The Legislature):
- গঠন: কেন্দ্রীয় স্তরে এটি সংসদ (লোকসভা ও রাজ্যসভা) এবং রাজ্য স্তরে বিধানসভা নিয়ে গঠিত।
- ক্ষমতা ও কাজ: আইন প্রণয়ন করা এর প্রধান কাজ। এছাড়াও এটি বাজেট অনুমোদন করে, শাসন বিভাগের কার্যাবলি পর্যবেক্ষণ করে এবং জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে সরকারের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করে।
২. কার্যনির্বাহী বিভাগ (The Executive):
- গঠন: কেন্দ্রীয় স্তরে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রিসভা এই বিভাগের প্রধান চালিকাশক্তি।
- ক্ষমতা ও কাজ: আইনসভার প্রণীত আইনগুলিকে কার্যকর ও বাস্তবায়ন করা এর প্রধান দায়িত্ব। নীতি নির্ধারণ, প্রশাসন পরিচালনা, আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পাদন এবং প্রতিরক্ষা নীতি কার্যকর করা এই বিভাগের আওতাভুক্ত। যেহেতু ভারত একটি সংসদীয় গণতন্ত্র, তাই কার্যনির্বাহী বিভাগ আইনসভার প্রতি দায়বদ্ধ থাকে।
৩. বিচার বিভাগ (The Judiciary):
- গঠন: সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট এবং অধস্তন আদালত নিয়ে গঠিত।
- ক্ষমতা ও কাজ: আইনের ব্যাখ্যা করা, নাগরিক ও রাষ্ট্রের মধ্যেকার বিরোধ নিষ্পত্তি করা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সংবিধানের অভিভাবক হিসেবে কাজ করা। বিচার বিভাগের সবচেয়ে শক্তিশালী ক্ষমতা হলো বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনা (Judicial Review), যার মাধ্যমে তারা আইনসভা প্রণীত কোনো আইন সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী কিনা, তা পরীক্ষা করতে পারে।
নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্যের প্রক্রিয়া
ভারতীয় সংবিধানে ক্ষমতার বিভাজন নীতিটিকে ‘নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য’ (Checks and Balances) ব্যবস্থার মাধ্যমে আরও শক্তিশালী করা হয়েছে। এই ব্যবস্থা নিশ্চিত করে যে এক বিভাগ তার ক্ষমতার অপব্যবহার করলে অন্য বিভাগ তাকে প্রতিহত করতে পারে:
- বিচার বিভাগ কর্তৃক নিয়ন্ত্রণ: বিচার বিভাগ আইনসভার প্রণীত আইন এবং কার্যনির্বাহী বিভাগের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলিকে পর্যালোচনা করে, যা সংবিধানের ঊর্ধ্বে যাওয়ার প্রবণতাকে রোধ করে।
- আইনসভা কর্তৃক নিয়ন্ত্রণ: আইনসভা অদক্ষতা বা সংবিধান লঙ্ঘনের জন্য রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি বা বিচারপতিদের অপসারণের (Impeachment) ক্ষমতা রাখে। এছাড়া, কার্যনির্বাহী বিভাগকে সংসদে আস্থা প্রমাণ করতে হয়।
- কার্যনির্বাহী বিভাগ কর্তৃক নিয়ন্ত্রণ: রাষ্ট্রপতি আইনসভা প্রণীত বিলে স্বাক্ষর করে তাকে আইনে পরিণত করেন, অথবা ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন।
উপসংহার
ভারতীয় চুক্তি আইন যেমন বাণিজ্যিক লেনদেনের ক্ষেত্রে আইনগত ভিত্তি তৈরি করে, তেমনি ভারতীয় সংবিধানের ক্ষমতার বিভাজন নীতি দেশের শাসন ব্যবস্থার আইনি ভিত্তি তৈরি করে। এই ত্রিস্তরীয় ক্ষমতাবিন্যাস রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে, স্বৈরাচারী শাসনের উত্থান রোধ করে এবং সর্বোপরি নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা সুরক্ষিত রাখে। একজন আইনের ছাত্র হিসেবে এই কাঠামো অনুধাবন করা অপরিহার্য, কারণ এটিই ভারতের গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের প্রাণ।



