
ভূমিকা
ভারতীয় চুক্তি আইন, ১৮৭২ (The Indian Contract Act, 1872) ভারতের দেওয়ানি আইনের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা দেশের বাণিজ্যিক এবং ব্যক্তিগত লেনদেনের ক্ষেত্রে আইনগত নিশ্চয়তা প্রদান করে। এই আইন ১৮৭২ সালের ২৫ এপ্রিল প্রণীত হয় এবং ১ সেপ্টেম্বর ১৮৭২ থেকে কার্যকর হয়। আইনটি মূলত চুক্তি সংক্রান্ত সাধারণ নীতি ও নিয়মগুলিকে সংজ্ঞায়িত করে, যা ভারতের সমস্ত চুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে। এটিকে ভারতের বাণিজ্যিক আইনের ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়, কারণ এই আইনই নির্ধারণ করে কখন একটি চুক্তি আইনগতভাবে কার্যকর (enforceable) হবে।
চুক্তির সংজ্ঞা ও শর্তাবলি
চুক্তি আইন অনুযায়ী, ‘চুক্তি’ হলো এমন একটি সম্মতি (Agreement) যা আইন দ্বারা কার্যকর করা যায় (Enforceable by law)। অন্যভাবে বলা যায়, একটি চুক্তি হলো বৈধভাবে কার্যকর করার যোগ্য একটি সম্মতি।
ধারা ২(ই) অনুসারে ‘সম্মতি’ (Agreement): যখন একাধিক পক্ষ কোনো কিছুতে নিজেদের মধ্যে সম্মত হয় এবং তাদের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিদান থাকে।
ধারা ২(এইচ) অনুসারে ‘চুক্তি’ (Contract): “An agreement enforceable by law is a contract.” (আইন দ্বারা কার্যকর করার যোগ্য সম্মতিই হলো চুক্তি)।
এই আইন চুক্তির একটি সুস্পষ্ট কাঠামো তৈরি করে। কোনো সম্মতিকে আইনগতভাবে চুক্তিতে পরিণত করতে হলে কিছু অপরিহার্য উপাদান থাকা বাধ্যতামূলক (ধারা ১০)।
বৈধ চুক্তির অপরিহার্য উপাদানসমূহ:
১. প্রস্তাব ও সম্মতি (Offer and Acceptance): চুক্তির জন্য এক পক্ষের স্পষ্ট প্রস্তাব এবং অন্য পক্ষের সেই প্রস্তাবে নিঃশর্ত সম্মতি থাকতে হবে। ২. আইনি সম্পর্ক স্থাপনের উদ্দেশ্য (Intention to Create Legal Relations): চুক্তিকারী পক্ষগুলোর মধ্যে অবশ্যই চুক্তির মাধ্যমে আইনি সম্পর্ক স্থাপনের স্পষ্ট উদ্দেশ্য থাকতে হবে (যেমন, ঘরোয়া বা সামাজিক সম্মতি সাধারণত চুক্তি হয় না)। ৩. বৈধ প্রতিদান (Lawful Consideration): প্রতিদান বা বিনিময় ছাড়া কোনো চুক্তিই বৈধ নয়। একে ‘Quid Pro Quo’ বা ‘something in return’ বলা হয়। এই প্রতিদান অবশ্যই বৈধ হতে হবে। ৪. পক্ষগণের যোগ্যতা (Capacity of Parties): চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া পক্ষদের আইনি যোগ্যতা থাকতে হবে। যেমন, তারা সুস্থ মনের প্রাপ্তবয়স্ক (মেজর) হতে হবে এবং আইন দ্বারা চুক্তি করতে অযোগ্য ঘোষিত হবেন না। ৫. স্বেচ্ছামূলক সম্মতি (Free Consent): চুক্তি সম্পাদনের জন্য পক্ষগণের সম্মতি সম্পূর্ণরূপে স্বেচ্ছামূলক হতে হবে। বলপ্রয়োগ (Coercion), অযাচিত প্রভাব (Undue Influence), জালিয়াতি (Fraud), ভুল তথ্য (Misrepresentation) বা ভুল (Mistake) দ্বারা প্রভাবিত সম্মতি বৈধ চুক্তি তৈরি করতে পারে না। ৬. বৈধ উদ্দেশ্য (Lawful Object): চুক্তির উদ্দেশ্য অবশ্যই আইনগতভাবে বৈধ হতে হবে। উদ্দেশ্য যদি জননীতির বিরোধী, প্রতারণামূলক বা অবৈধ হয়, তবে সেই চুক্তি বাতিল হবে। ৭. সুনির্দিষ্টতা (Certainty): চুক্তির শর্তাবলী অবশ্যই সুনির্দিষ্ট এবং স্পষ্ট হতে হবে। কোনো অস্পষ্ট বা অনির্দিষ্ট চুক্তি কার্যকর করা যায় না। ৮. বাতিল বলে ঘোষিত না হওয়া (Not Expressly Declared Void): আইন দ্বারা সুস্পষ্টভাবে বাতিল বলে ঘোষিত হয়নি এমন বিষয় নিয়ে চুক্তি করতে হবে (যেমন, জুয়া সংক্রান্ত চুক্তি)।
চুক্তির প্রকারভেদ
আইনটি চুক্তিকে বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করে, যার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো:
- কার্যকর চুক্তি (Valid Contract): যে চুক্তিতে সমস্ত অপরিহার্য উপাদান বিদ্যমান থাকে এবং যা আইন দ্বারা কার্যকর করা যায়।
- বাতিল চুক্তি (Void Contract): যে চুক্তি আইনগতভাবে আর কার্যকর করা যায় না (যেমন, চুক্তি করার পর তার উদ্দেশ্য অবৈধ হয়ে গেলে)।
- বাতিলযোগ্য চুক্তি (Voidable Contract): যে চুক্তি এক বা একাধিক পক্ষের ইচ্ছানুযায়ী বাতিল করা যেতে পারে (যেমন, যখন বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সম্মতি আদায় করা হয়)।
গুরুত্ব ও তাৎপর্য
১৮৭২ সালের এই আইনটি ভারতীয় অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং নাগরিক জীবনকে স্থিতিশীলতা দিয়েছে। এটি বিভিন্ন পক্ষগুলির অধিকার, কর্তব্য এবং দায়বদ্ধতাগুলিকে স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করে, যার ফলে ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপনে ঝুঁকি হ্রাস পায়। এটি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য একটি আইনি কাঠামো প্রদান করে, যা আইনি প্রতিকার এবং ক্ষতির (Damages) বিধান নিশ্চিত করে। এই আইনের মাধ্যমেই আদালত নিশ্চিত করে যে কোনো পক্ষ যেন প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করে অন্য পক্ষের ক্ষতি করতে না পারে।
উপসংহার
ভারতীয় চুক্তি আইন, ১৮৭২, আজও তার মৌলিক কাঠামো ও নীতিগুলির জন্য প্রাসঙ্গিক। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এটি ভারতের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্কগুলিকে নিয়ন্ত্রণ ও সুরক্ষা প্রদান করে আসছে, যা এটিকে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আইন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।



