
ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৯৮এ (Section 498A) ধারা বা বধূ নির্যাতন আইন নিয়ে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিল কর্ণাটক হাইকোর্ট। আদালতের স্পষ্ট নির্দেশ, স্বামী বা স্বামীর পরিবারের সদস্য না হয়ে শুধুমাত্র প্রতিবেশী হওয়ার কারণে কোনো ব্যক্তিকে এই ধারার আওতায় অভিযুক্ত করা যাবে না। ‘প্রতিবেশী কখনোই আত্মীয়ের সংজ্ঞায় পড়েন না’—এই যুক্তিতে জনৈক এক নারীর বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ খারিজ করে দিয়েছে আদালত।
মামলার প্রেক্ষাপট ও অভিযোগের সূত্রপাত
ঘটনাটি ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের। বেঙ্গালুরুর মহালক্ষ্মী লেআউট পুলিশ থানায় জনৈক এক নারী তাঁর স্বামী মনুরাথনম্মা এবং তাঁর শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের বিরুদ্ধে একটি এফআইআর (FIR) দায়ের করেন। অভিযোগকারিণীর দাবি ছিল, বিয়ের পর থেকেই তাঁর স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি এবং ননদ অতিরিক্ত যৌতুক ও সোনার গয়নার দাবিতে তাঁর ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালাতেন।
তবে এই মামলার মোড় ঘোরে তখন, যখন অভিযোগকারিণী তাঁর স্বামীর এক প্রতিবেশী ‘আশা জি’-কেও এই মামলায় জড়িয়ে দেন। অভিযোগে বলা হয়, প্রতিবেশী ওই নারী তাঁর স্বামীকে উস্কানি দিতেন এবং পরিবারের অন্যদের সাথে মিলে অভিযোগকারিণীর জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছিলেন। সেই ভিত্তিতেই পুলিশ ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৯৮এ (বধূ নির্যাতন), ৫০৪ (শান্তিভঙ্গের উদ্দেশ্যে অপমান), ৫০৬ (হুমকি) এবং ৩২৩ ধারার পাশাপাশি যৌতুক নিরোধক আইনের ৩ ও ৪ নম্বর ধারায় চার্জশিট দাখিল করে।
হাইকোর্টে আবেদন ও আইনি লড়াই
প্রতিবেশী আশা জি নিজেকে নির্দোষ দাবি করে এবং এই হয়রানিমূলক মামলা থেকে নিষ্কৃতি পেতে কর্ণাটক হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। তাঁর আইনজীবীর প্রধান যুক্তি ছিল, ৪৯৮এ ধারাটি বিশেষভাবে ‘স্বামী বা স্বামীর আত্মীয়দের’ (Husband or relative of husband) জন্য প্রযোজ্য। যেহেতু আবেদনকারী আশা জি অভিযোগকারিণীর স্বামীর সাথে কোনো রক্ত সম্পর্কের বা বৈবাহিক সম্পর্কের আত্মীয় নন, তাই তাঁকে এই ধারায় অভিযুক্ত করা আইনের অপব্যবহার।
আবেদনকারী আরও দাবি করেন যে, শুধুমাত্র ‘উস্কানি দেওয়া’ বা ‘মানসিকভাবে সহযোগিতা করার’ মতো অস্পষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত করা যায় না। এটি নিছক ব্যক্তিগত শত্রুতা মেটানোর একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
আদালতের পর্যবেক্ষণ ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
মামলার শুনানি চলাকালীন কর্ণাটক হাইকোর্ট সুপ্রিম কোর্টের একাধিক নজির (যেমন: রমেশ কনৌজিয়া বনাম উত্তরাখণ্ড রাজ্য) পর্যালোচনা করে। আদালত লক্ষ্য করে যে, চার্জশিটে আশা জি-এর বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট শারীরিক নির্যাতনের প্রমাণ নেই।
বিচারপতি তাঁর পর্যবেক্ষণে জানান, “আইনত প্রতিবেশী কোনোভাবেই আত্মীয়ের সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন না। ৪৯৮এ ধারাটি একটি বিশেষ শাস্তিমূলক ধারা এবং এর প্রয়োগ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে করা উচিত।” আদালত আরও যোগ করে যে, দাম্পত্য কলহে তৃতীয় পক্ষ বা প্রতিবেশীকে টেনে আনা আইনের মূল উদ্দেশ্যের পরিপন্থী। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে ৬ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে আদালত আশা জি-এর বিরুদ্ধে সমস্ত মামলা খারিজ করার নির্দেশ দেয়। তবে আদালত স্পষ্ট করেছে যে, অভিযোগকারিণীর স্বামী ও তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা যথারীতি চলবে।
রায়ের তাৎপর্য
এই রায়টি ভবিষ্যতে ৪৯৮এ ধারার অপব্যবহার রোধে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, পারিবারিক বিবাদে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে প্রতিবেশী বা দূর সম্পর্কের পরিচিতদেরও অভিযুক্ত করা হয়। কর্ণাটক হাইকোর্টের এই সিদ্ধান্ত স্পষ্ট করে দিল যে, আত্মীয়তার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া কাউকে এই ধারার আওতায় আনা আইনত সম্ভব নয়।



