হাইকোর্ট

চার দশক কারাগারে বন্দিদশার পর, বেকসুর খালাস

কেরালা হাইকোর্ট সম্প্রতি একটি ঐতিহাসিক রায়ে প্রায় চার দশক ধরে চলা একটি মামলার নিষ্পত্তি করেছে। এই রায়ে আদালত এক ব্যক্তিকে বেকসুর খালাস দিয়েছে, যাকে প্রায় ৩৮ বছর আগে একটি জাল ১০০ ডলারের নোট রাখার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছিল।

মামলার প্রেক্ষাপট ও রায়

মামলাটির মূল অভিযুক্ত ছিলেন আব্দুল হাকিম। ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৮৭ সালে যখন তিরুবনন্তপুরম বিমানবন্দরের কাছে তাঁর কাছ থেকে পুলিশ একটি জাল ১০০ ডলারের নোট উদ্ধার করেছিল বলে অভিযোগ ওঠে। প্রসিকিউশন দাবি করেছিল যে, হাকিম সেই নোটটি আসল বলে চালানোর চেষ্টা করেছিলেন এবং টহলরত একজন সাব-ইন্সপেক্টর তাঁকে ধরে ফেলেন।

এই ঘটনার প্রায় ২২ বছর পর, ২০০৯ সালে কোলামের একটি দায়রা আদালত তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ৫,০০০ টাকা জরিমানা করে। এই সাজা এবং দোষী সাব্যস্ত হওয়ার বিরুদ্ধে হাকিম হাইকোর্টে আপিল করেন।

অভিযুক্তের দাবি ও হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ

আব্দুল হাকিম হাইকোর্টে জানান যে তিনি বিমানবন্দরে কুলির কাজ করতেন। তিনি বিদেশি পর্যটকদের মালপত্র বহন করার মজুরি হিসেবে এই নোটটি পেয়েছিলেন। তিনি জানতেনই না যে নোটটি জাল। নোটটির ছেঁড়া অংশ টেপ দিয়ে জোড়া লাগানো দেখে অন্য শ্রমিকদের সঙ্গে তাঁর বচসা শুরু হয়। সেই সময়ই পুলিশ এসে তাঁকে আটক করে।

মামলার শুনানিতে বিচারপতি জনসন জন পর্যবেক্ষণ করেন যে, ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৮সি ধারায় কাউকে দোষী সাব্যস্ত করতে গেলে প্রসিকিউশনকে দুটি বিষয় প্রমাণ করতেই হবে: ১. অভিযুক্ত ব্যক্তি জানতেন যে নোটটি জাল। ২. তিনি সেই নোটটিকে আসল হিসেবে ব্যবহার করার উদ্দেশ্য নিয়েই রেখেছিলেন বা ব্যবহার করার চেষ্টা করেছিলেন।

বিচারপতি জন উল্লেখ করেন, কেবলমাত্র জাল নোট কারও দখলে পাওয়া গেলেই ৪৯৮সি ধারার অধীনে অপরাধ প্রমাণিত হয় না। হাইকোর্ট দেখতে পায় যে, ট্রায়াল কোর্ট পুলিশের কাছে দেওয়া বিবৃতিগুলিকে মূল প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করে ভুল করেছে।

তাছাড়া, প্রসিকিউশনের আনা সাক্ষ্য-প্রমাণেও বেশ কিছু গুরুতর ঘাটতি ছিল। দুজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী নিজেদের বক্তব্য থেকে সরে যান (hostile) এবং মূল তদন্তকারী অফিসার ততদিনে মারা গিয়েছিলেন। একমাত্র সাব-ইন্সপেক্টরের সাক্ষ্য ছিল, যা ছিল ঘটনাস্থলে উপস্থিত অন্যদের কাছ থেকে শোনা কথা (hearsay information)। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ফৌজদারি কার্যবিধির ৩১৩ ধারা অনুযায়ী হাকিমকে যখন প্রশ্ন করা হয়, তখন তাঁর কাছে এই নোটটি যে জাল ছিল, সে সম্পর্কে তাঁর সচেতন জ্ঞান (conscious possession) ছিল কি না, তা জিজ্ঞাসা করা হয়নি। আদালত এই ত্রুটিকে প্রসিকিউশনের জন্য ‘মারাত্মক’ বলে আখ্যা দেয়।

সমস্ত ত্রুটি ও ঘাটতি তুলে ধরে আদালত এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, অভিযুক্ত ব্যক্তি “সন্দেহের সুবিধা” (benefit of doubt) পাওয়ার যোগ্য। ফলস্বরূপ, প্রায় চার দশক ধরে চলা এই মামলায় কেরালা হাইকোর্ট আব্দুল হাকিমের সাজা এবং দোষী সাব্যস্ত হওয়ার রায় বাতিল করে তাঁকে বেকসুর খালাস দেয়।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button