আইনশিক্ষা

লিভ-ইন রিলেশনশিপ: বৈধতা ও আইনি অধিকার

ভূমিকা: লিভ-ইন রিলেশনশিপের আইনি স্বীকৃতি

লিভ-ইন রিলেশনশিপ বলতে বোঝায় যখন দুজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ না হয়েও স্বামী-স্ত্রীর মতো একসঙ্গে বসবাস করেন এবং শারীরিক সম্পর্ক বজায় রাখেন। একবিংশ শতাব্দীর ভারতে এই সম্পর্কের গ্রহণযোগ্যতা বাড়লেও, এটি এখনও সম্পূর্ণরূপে ঐতিহ্যবাহী বিবাহের সমতুল্য আইনি মর্যাদা পায়নি।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, ভারতে লিভ-ইন রিলেশনশিপ বৈধ (Legal)। ভারতীয় সংবিধানের ২১ নং অনুচ্ছেদ (Article 21), যা জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার নিশ্চিত করে, সেই অধিকারের অংশ হিসেবেই দুজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি একসঙ্গে থাকার স্বাধীনতা পান। তবে, এটিকে বৈধ সম্পর্ক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি এর সঙ্গে যুক্ত কিছু আইনি অধিকার ও কর্তব্যও রয়েছে।

আইনি অধিকার এবং সুরক্ষা

লিভ-ইন রিলেশনশিপকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিবাহ হিসেবে গণ্য করা না হলেও, সুপ্রিম কোর্ট বিভিন্ন রায়ের মাধ্যমে এর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিশেষত নারীদের ও সন্তানদের অধিকারকে সুরক্ষিত করেছে:

১. গার্হস্থ্য হিংসা থেকে সুরক্ষা (Protection under Domestic Violence Act)

লিভ-ইন রিলেশনশিপে থাকা নারীদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি সুরক্ষাটি আসে ‘গার্হস্থ্য হিংসা থেকে মহিলাদের সুরক্ষা আইন, ২০০৫’ (Protection of Women from Domestic Violence Act, 2005) থেকে।

  • সংজ্ঞা: এই আইন অনুসারে, যদি দুজন ব্যক্তি এমন কোনো সম্পর্কে থাকেন যা বিবাহের প্রকৃতির (in the nature of marriage) হয় এবং তারা একত্রে বসবাস করেন, তবে সেই নারীকে গার্হস্থ্য সঙ্গী (Domestic Partner) হিসেবে গণ্য করা হবে।

  • আইনি সুবিধা: এই আইনের অধীনে, লিভ-ইন সঙ্গীর দ্বারা কোনো ধরনের শারীরিক, মানসিক, মৌখিক, যৌন বা আর্থিক হিংসার শিকার হলে নারী সুরক্ষা পেতে পারেন। তিনি আশ্রয় (Residence), ক্ষতিপূরণ (Compensation) এবং রক্ষণাবেক্ষণের (Maintenance) দাবি জানাতে পারেন।

২. সন্তানের অধিকার (Child Rights)

লিভ-ইন রিলেশনশিপে জন্ম নেওয়া সন্তানদের আইনি মর্যাদা নিয়ে ভারতে কোনো বিতর্ক নেই।

  • বৈধ সন্তান: সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করেছে যে, যদি লিভ-ইন সম্পর্কটি দীর্ঘদিনের এবং বিবাহের প্রকৃতির হয়, তবে সেই সম্পর্ক থেকে জন্ম নেওয়া সন্তানকে বৈধ সন্তান (Legitimate Child) হিসেবে গণ্য করা হবে।

  • সম্পত্তির অধিকার: এই সন্তানরা তাদের বাবা-মায়ের স্ব-অর্জিত সম্পত্তিতে (Self-Acquired Property) বিবাহের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া সন্তানের মতোই উত্তরাধিকারের পূর্ণ অধিকার ভোগ করবে।

৩. ভরণপোষণ বা রক্ষণাবেক্ষণের অধিকার (Maintenance)

যদিও ডিভোর্সের মতো ভরণপোষণ দাবি করার কোনো নির্দিষ্ট আইন নেই, তবুও কিছু ক্ষেত্রে আদালত ভরণপোষণের নির্দেশ দিয়েছে:

  • সিআরপিসি ধারা ১২৫: ফৌজদারি কার্যবিধি (CrPC) এর ধারা ১২৫ এর অধীনে একজন নারী তাঁর লিভ-ইন সঙ্গীর কাছে ভরণপোষণ দাবি করতে পারেন, যদি সম্পর্কটি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং বিবাহের প্রতিশ্রুতি বা প্রকৃতির প্রমাণ থাকে।

  • ডিভি অ্যাক্ট: গার্হস্থ্য হিংসা আইনের অধীনেও আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে রক্ষণাবেক্ষণ দাবি করা সম্ভব।

সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ

বিভিন্ন ঐতিহাসিক মামলায় সুপ্রিম কোর্ট লিভ-ইন সম্পর্ককে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং এর আইনি দিকগুলিকে সংজ্ঞায়িত করেছে:

ক. ডি. ভেলুসামী বনাম ডি. পাট্টি (D. Velusamy vs D. Patchaiammal, 2010)

এই মামলায় সুপ্রিম কোর্ট নির্ধারণ করে যে কখন একটি লিভ-ইন সম্পর্ককে ‘বিবাহের প্রকৃতির সম্পর্ক’ হিসেবে গণ্য করা হবে। আদালত এই ধরনের সম্পর্ক প্রমাণের জন্য কিছু শর্ত আরোপ করে:

১. সঙ্গীদের অবশ্যই নিজেদেরকে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে সমাজে পরিচিত করতে হবে। ২. তাদের একসঙ্গে বসবাস করতে হবে এবং তা হতে হবে দীর্ঘস্থায়ী। ৩. তাদের অবশ্যই আইনি বয়স (পুরুষ ২১, নারী ১৮) পেরোতে হবে এবং অন্য কোনো বৈধ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ থাকা চলবে না।

খ. ইন্দ্র শর্মা বনাম ভি.কে.ভি. শর্মা (Indra Sharma vs V.K.V. Sharma, 2013)

এই মামলায় সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্টভাবে রায় দেয় যে লিভ-ইন রিলেশনশিপ বৈধ (Valid) এবং এই সম্পর্ক থেকে জন্ম নেওয়া সন্তানরা বৈধ। আদালত এটিকে সমাজের একটি পরিবর্তিত রূপ হিসেবে স্বীকার করে।

গ. এস.পি.এস. বনাম স্টেটস (S.P.S. Balasubramanyam vs State, 1994)

এই মামলায় সুপ্রিম কোর্ট পর্যবেক্ষণ করে যে, যদি একজন পুরুষ এবং একজন নারী দীর্ঘদিন ধরে স্বামী-স্ত্রীর মতো বসবাস করেন, তবে আইন সেই সম্পর্কটিকে বিবাহ হিসেবেই ধরে নেবে এবং তাদের সন্তানরা সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবে।

সীমাবদ্ধতা ও সতর্কতা

লিভ-ইন রিলেশনশিপ বৈধ হলেও এর কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে যা জানা প্রয়োজন:

  • উত্তরাধিকার: আইনত স্বামী-স্ত্রী না হওয়ায় সঙ্গীর পৈতৃক সম্পত্তিতে লিভ-ইন সঙ্গীর সরাসরি কোনো অধিকার থাকে না।

  • সহজে সমাপ্তি: এই সম্পর্ক শুরু বা শেষ করার জন্য কোনো আইনি রেজিস্ট্রেশন বা ডিভোর্সের প্রয়োজন হয় না। যেকোনো পক্ষ যেকোনো সময় সম্পর্ক শেষ করতে পারে।

  • দ্বিচারিতা: যদি কোনো একজন সঙ্গী ইতিমধ্যেই অন্য কোনো বৈধ বিবাহে আবদ্ধ থাকেন, তবে দ্বিতীয় লিভ-ইন সম্পর্কটি আইনি সুরক্ষা নাও পেতে পারে।

উপসংহার

ভারতে লিভ-ইন রিলেশনশিপকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে কারণ এটি জীবনধারণের সাংবিধানিক অধিকারের একটি অংশ। সুপ্রিম কোর্ট বিভিন্ন আইন ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এই সম্পর্কের মধ্যে থাকা নারীদের এবং বিশেষত সন্তানদের অধিকার সুরক্ষিত করেছে। তবে, এটি যেহেতু সামাজিক ও প্রথাগত বিবাহ থেকে আলাদা, তাই এতে প্রবেশের আগে আইনি ঝুঁকি ও অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button