খবরাখবর

অন্ধবিশ্বাসের দায়ে দেবমূর্তি সরানো যাবে না: ব্যক্তি স্বাধীনতায় রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ রুখল মাদ্রাজ হাইকোর্ট

সম্প্রতি মাদ্রাজ হাইকোর্ট একটি মামলার শুনানিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছে। আদালত জানিয়েছে, কেবল অন্ধবিশ্বাস বা অযৌক্তিক আশঙ্কার ওপর ভিত্তি করে রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তির নিজস্ব চত্বর থেকে দেবতার প্রতিমা সরিয়ে দিতে বা বাজেয়াপ্ত করতে পারে না। নাগরিকদের মধ্যে বৈজ্ঞানিক মানসিকতা গড়ে তোলা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, অন্ধবিশ্বাসকে প্রশ্রয় দেওয়া নয়।

মামলার প্রেক্ষাপট

ঘটনাটি চেন্নাইয়ের এননোর এলাকার। সেখানে এ. কার্তিক নামে এক ব্যক্তি তাঁর নিজস্ব সম্পত্তিতে দেবী শিবশক্তি দক্ষিণেশ্বরী, গণেশ এবং বীরভদ্রের প্রতিমা স্থাপন করেছিলেন। তিনি নিজের বাড়িতেই নিয়মিত পূজা করতেন এবং মাঝে মাঝে প্রতিবেশী বা ভক্তদের সেখানে যোগ দেওয়ার অনুমতি দিতেন। কিন্তু গোল বাঁধে যখন এলাকার কিছু প্রতিবেশী দাবি করেন যে, ওই প্রতিমা স্থাপনের পর থেকে এলাকায় কয়েকটি ‘অপ্রাকৃতিক মৃত্যু’ ঘটেছে। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, এই প্রতিমা বা পূজাই সেই অশুভ ঘটনার কারণ। এই অন্ধবিশ্বাসের ভিত্তিতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ কার্তিকের বাড়ি থেকে প্রতিমাগুলো বাজেয়াপ্ত করে নিয়ে যায়।

আদালতের কড়া অবস্থান

কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কার্তিক হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। বিচারপতি ডি. ভরত চক্রবর্তী মামলার শুনানি চলাকালীন স্পষ্ট করে দেন যে, কোনো দেবমূর্তি মানুষের ক্ষতি করতে পারে না। সমাজে ঘটে যাওয়া কোনো দুর্ঘটনা বা মৃত্যুকে দেবতার পূজার সঙ্গে যুক্ত করা সম্পূর্ণভাবে একটি অন্ধবিশ্বাস এবং অনৈতিক ধারণা। আদালত জানায়, কেবল গুটিকয়েক মানুষের অমূলক ভয় বা কুসংস্কারের চাপে পড়ে রাষ্ট্র কোনো নাগরিকের মৌলিক অধিকারে হস্তক্ষেপ করতে পারে না।

সাংবিধানিক অধিকার ও বৈজ্ঞানিক চিন্তা

আদালত এই রায়ে ভারতের সংবিধানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলে:

  • ধর্মীয় স্বাধীনতা: নিজের জায়গায় শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিমা স্থাপন করা এবং উপাসনা করা একটি মৌলিক অধিকার। এতে বাধা দেওয়ার এক্তিয়ার প্রশাসনের নেই।

  • বৈজ্ঞানিক মানসিকতা: রাষ্ট্রের কর্তব্য হলো নাগরিকদের মধ্যে যুক্তিবাদী ও বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারা (Scientific Temper) উৎসাহিত করা। কুসংস্কারের ভিত্তিতে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া আইনের শাসনের পরিপন্থী।

  • শৃঙ্খলার প্রশ্ন: যদি কোনো প্রতিবেশীর অসুবিধা হয়, তবে প্রশাসন শব্দদূষণ বা বিশৃঙ্খলা রুখতে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে, কিন্তু সরাসরি প্রতিমা বাজেয়াপ্ত করা সমর্থনযোগ্য নয়।

হাইকোর্টের নির্দেশ ও শর্তাবলি

আদালত কার্তিককে তাঁর প্রতিমাগুলো ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে, তবে জনস্বার্থে কিছু শর্ত আরোপ করা হয়েছে: ১. পূজা চলাকালীন কোনো লাউডস্পিকার বা তারস্বরে শব্দ করা যাবে না যাতে প্রতিবেশীদের শান্তিতে ব্যাঘাত ঘটে। ২. উপাসনার নামে জনসাধারণের কাছ থেকে কোনো প্রকার অর্থ সংগ্রহ করা যাবে না। ৩. যদি বাড়ির কোনো নির্মাণকাজ বেআইনি হয়ে থাকে, তবে প্রশাসন আলাদাভাবে আইনি প্রক্রিয়া চালাতে পারে, কিন্তু তার সঙ্গে পূজার বিষয়টিকে গুলিয়ে ফেলা যাবে না।

মাদ্রাজ হাইকোর্টের এই রায় ব্যক্তিগত ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং কুসংস্কারমুক্ত সমাজ গড়ার পথে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button