সুপ্রিমকোর্ট

জমি কেনা-বেচা যেন এক বিভীষিকা: সুপ্রিম কোর্টের তোপ ও ব্লকচেইন প্রযুক্তির দিশা

ভারতে একটি নিজস্ব বাড়ি বা এক টুকরো জমি কেনা অনেকের কাছেই জীবনের স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে যে আইনি জটিলতা, প্রতারণা এবং মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তাকেই সুপ্রিম কোর্ট “ট্রম্যাটিক অভিজ্ঞতা” বলে বর্ণনা করেছে। আদালতের মতে, বর্তমান সেকেলে আইন ও পদ্ধতি মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে।

আদালতের পর্যবেক্ষণে সমস্যার মূল কারণ

সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি পি. এস. নারাসিমহা এবং জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চ লক্ষ্য করেছেন যে, ভারতে সম্পত্তির মালিকানা নির্ধারণের প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল ও অস্পষ্ট। বর্তমানে কেবল একটি দলিল রেজিস্ট্রি হওয়াই মালিকানার চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে গণ্য হয় না। এর ফলে একই জমি একাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করা বা জাল নথি তৈরি করার মতো জালিয়াতি অহরহ ঘটছে।

আদালত বিশেষ করে বিহারের ২০১৯ সালের একটি নিয়মকে উদাহরণ হিসেবে টেনে বলেছে যে, অনেক সময় রেজিস্ট্রেশন অফিসারেরা মিউটেশন বা খতিয়ানের মতো বাড়তি নথির জন্য দাবি করেন, যা সাধারণ ক্রেতার জন্য প্রক্রিয়াটিকে আরও দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল করে তোলে। পরিসংখ্যান বলছে, ভারতের আদালতগুলোতে চলা দেওয়ানি মামলাগুলোর প্রায় ৬৬ শতাংশই সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে।

সমাধান হিসেবে ‘ব্লকচেইন’ প্রযুক্তির ডাক

এই জট কাটাতে সুপ্রিম কোর্ট কেবল সমস্যার কথা বলেই থেমে থাকেনি, বরং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের সুপারিশ করেছে। আদালত ল কমিশন অফ ইন্ডিয়াকে (Law Commission of India) নির্দেশ দিয়েছে যে, সম্পত্তি রেজিস্ট্রেশন ব্যবস্থায় কীভাবে ‘ব্লকচেইন প্রযুক্তি’ (Blockchain Technology) ব্যবহার করা যায়, সে বিষয়ে একটি বিস্তারিত রিপোর্ট তৈরি করতে।

কেন ব্লকচেইন জরুরি?

  • অপরিবর্তনীয় তথ্য: ব্লকচেইনে একবার কোনো তথ্য বা মালিকানার ইতিহাস নথিভুক্ত হলে তা হ্যাক করা বা পরিবর্তন করা প্রায় অসম্ভব।

  • স্বচ্ছতা: ক্রেতা খুব সহজেই ডিজিটাল পদ্ধতিতে দেখে নিতে পারবেন সম্পত্তির প্রকৃত মালিক কে এবং আগে কতবার এটি হাতবদল হয়েছে।

  • জালিয়াতি রোধ: একই জমি একাধিকবার বিক্রির সুযোগ বন্ধ হবে, কারণ প্রতিটি লেনদেন ডিজিটালভাবে সুরক্ষিত থাকবে।

সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব

বর্তমানে একজন সাধারণ মানুষকে জমি কিনতে গিয়ে উকিল ধরা থেকে শুরু করে পুরনো রেকর্ড যাচাই করার জন্য বছরের পর বছর দৌড়াদৌড়ি করতে হয়। এই প্রক্রিয়ায় প্রচুর সময় ও অর্থের অপচয় হয়। সুপ্রিম কোর্ট মনে করে, প্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগ হলে সাধারণ মানুষ এই মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবে এবং সম্পত্তি কেনা-বেচা অনেক বেশি নিরাপদ ও গতিশীল হবে।

উপসংহার: সুপ্রিম কোর্টের এই কঠোর মন্তব্য দেশের আইনপ্রণেতাদের জন্য একটি বড় বার্তা। ঔপনিবেশিক আমলের পুরনো আইন বদলে ডিজিটাল ও স্বচ্ছ ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাওয়াই এখন সময়ের দাবি। যদি ব্লকচেইন প্রযুক্তির মাধ্যমে সংস্কার সম্ভব হয়, তবে জমি কেনা আর “ট্রম্যাটিক” বা যন্ত্রণাদায়ক কোনো অভিজ্ঞতা থাকবে না।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button