রাজধর্ম ও ভগবদ্গীতার শিক্ষা: কর্মীদের অনিশ্চয়তা নিয়ে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্টের কড়া বার্তা

প্রজাতন্ত্রের স্তম্ভ হিসেবে রাষ্ট্রের প্রধান কাজ হলো জনগণের সেবা এবং ন্যায়বিচার সুনিশ্চিত করা। সম্প্রতি পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্ট একটি মামলার রায়ে এই ‘রাজধর্ম’ এবং ‘ভগবদ্গীতা’র শ্লোক উদ্ধৃত করে এক যুগান্তকারী পর্যবেক্ষণ দিয়েছে। আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, রাষ্ট্র তার কর্মীদের বছরের পর বছর ধরে অনিশ্চয়তা বা অস্থায়ী অবস্থার (Endless Precarity) মধ্যে আটকে রাখতে পারে না।
মামলার প্রেক্ষাপট
মামলাটি ছিল মূলত হরিয়ানা সরকারের অধীনস্থ কয়েকজন চুক্তিভিত্তিক বা অস্থায়ী কর্মীকে নিয়ে। এই কর্মীরা দীর্ঘ প্রায় ১৫-২০ বছর ধরে একই পদে কাজ করে আসছিলেন। কিন্তু তাদের চাকরিতে স্থায়ী করা বা নিয়মিতকরণ (Regularization) করা হচ্ছিল না। সরকার পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল যে, যেহেতু তারা নির্দিষ্ট চুক্তির ভিত্তিতে কাজ করছেন, তাই তাদের স্থায়ী করার কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। এই দীর্ঘস্থায়ী বঞ্চনার বিরুদ্ধেই কর্মীরা আদালতের দ্বারস্থ হন।
আদালতের পর্যবেক্ষণ ও রাজধর্মের উল্লেখ
বিচারপতি সন্দীপ মউদগিলের বেঞ্চে এই মামলার শুনানি চলাকালীন অত্যন্ত কঠোর ভাষায় রাষ্ট্রের সমালোচনা করেন। আদালত জানায়:
১. মডেল এমপ্লয়ার বা আদর্শ নিয়োগকর্তা: আদালত বলেছে, রাষ্ট্র কোনো বেসরকারি মুনাফাখোর প্রতিষ্ঠান নয়। রাষ্ট্রকে সবসময় একজন ‘আদর্শ নিয়োগকর্তা’ হিসেবে আচরণ করতে হবে। নাগরিকদের শ্রম ব্যবহার করে বিনিময়ে তাদের অনিশ্চয়তায় রাখা রাষ্ট্রের কাজ নয়।
২. রাজধর্মের সংজ্ঞা: রায়ে প্রাচীন ভারতীয় দর্শনের ‘রাজধর্ম’ প্রসঙ্গটি টেনে আনা হয়েছে। প্রাচীনকালে রাজার প্রধান ধর্ম ছিল প্রজা বা নাগরিকদের কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং তাদের শোষণের হাত থেকে রক্ষা করা। আধুনিক গণতান্ত্রিক কাঠামোতেও সরকারের উচিত সেই ধর্ম পালন করা।
৩. ভগবদ্গীতার শ্লোক: আদালত ভগবদ্গীতার শ্লোক উল্লেখ করে কর্ম ও ফলের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেছে। একজন কর্মী যখন তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য উৎসর্গ করেন, তখন বিনিময়ে তাকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দেওয়া ওই প্রতিষ্ঠানের নৈতিক দায়িত্ব।
অনিশ্চয়তা ও মানবাধিকার
আদালত ‘Endless Precarity’ বা ‘অফুরন্ত অনিশ্চয়তা’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিচারপতি মন্তব্য করেন যে, একজন মানুষ যখন জানেন না যে আগামী মাসে তার চাকরি থাকবে কি না, তখন তার পক্ষে মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করা অসম্ভব। এটি সরাসরি সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে বর্ণিত ‘বাঁচার অধিকার’-এর পরিপন্থী।
আদালত আরও যোগ করে যে, রাষ্ট্র যদি নিয়মিত কাজের জন্য বারবার অস্থায়ী লোক নিয়োগ করতে থাকে, তবে তা আসলে স্থায়ী পদগুলোকে অবমাননা করার এবং কম বেতনে শ্রম শোষণ করার একটি কৌশল মাত্র।
রায়ের ফলাফল ও নির্দেশিকা
আদালত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছে যে:
-
যে সমস্ত কর্মী দীর্ঘ সময় ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে আসছেন, তাদের নিয়মিতকরণের বিষয়টি সহানুভূতির সাথে বিচার করতে হবে।
-
রাষ্ট্রকে তার নীতিতে বদল আনতে হবে যাতে কর্মীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি না হয়।
-
আইনি মারপ্যাঁচে ফেলে কোনো সাধারণ মানুষের ন্যায্য অধিকার যেন হরণ করা না হয়।
উপসংহার
পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্টের এই রায়টি ভারতের শ্রম আইনের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। এটি কেবল কিছু কর্মীর চাকরির নিশ্চয়তাই দেয় না, বরং রাষ্ট্রকে তার নৈতিক দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়। আদালত বুঝিয়ে দিয়েছে যে, আইনের উর্ধ্বে মানবিকতা এবং ন্যায়বিচারই হলো প্রকৃত ‘রাজধর্ম’।



