মুন্নামবাম ওয়াক্ফ জমি দখল ইস্যুতে কেরল হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে নোটিশ জারি করল সুপ্রিম কোর্ট

এই মামলাটি কেরলের এর্নাকুলাম জেলার মুন্নামবামে অবস্থিত বিশাল পরিমাণ ওয়াক্ফ সম্পত্তি এবং কেরল স্টেট ওয়াক্ফ বোর্ডের ক্ষমতার সীমা নিয়ে একটি গভীর আইনি বিতর্ককে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে। মামলার শিরোনাম: Kerala Waqf Samrakshana Vedhi & Ors. vs. State of Kerala
১. মামলার প্রেক্ষাপট ও ঘটনাপ্রবাহ (Background and Narrative)
জমি ও আদি উৎসর্গ (Endowment):
মামলার কেন্দ্রে রয়েছে এর্নাকুলাম জেলার মুন্নামবামে অবস্থিত প্রায় ৪০৪ একর উপকূলীয় জমি। ১৯৫০ সালে মোহাম্মদ সিদ্দিক সাইত নামক এক ব্যক্তি এই জমিটি শিক্ষামূলক এবং দাতব্য উদ্দেশ্যে ফারুক কলেজ পরিচালনা কমিটির অনুকূলে একটি ‘এনডাওমেন্ট ডিড’ (দানপত্র) দ্বারা উৎসর্গ করেছিলেন।
সংঘাতের সূত্রপাত:
দীর্ঘ প্রায় সাত দশক পর, ২০১৯ সালে কেরল স্টেট ওয়াক্ফ বোর্ড একতরফাভাবে ওই বিশাল পরিমাণ উপকূলীয় জমিকে ওয়াক্ফ সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণা করে একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে। বোর্ডের এই আচমকা পদক্ষেপ বহু সৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত (bona fide) ভূমি মালিক এবং দখলদারদের জীবিকা ও সম্পত্তির অধিকারকে বিপন্ন করে তোলে। ওয়াক্ফ বোর্ডের একতরফা ক্ষমতা প্রয়োগ এবং তাদের এই ঘোষণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে রাজ্যের বিভিন্ন পক্ষ আদালতে মামলা করে।
রাজ্য সরকারের হস্তক্ষেপ:
ওয়াক্ফ বোর্ডের ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে এবং সাধারণ জনগণের স্বার্থ রক্ষার জন্য রাজ্য সরকার তদন্তের নির্দেশ দেয়। সরকার ‘কমিশনস অফ ইনকোয়ারি অ্যাক্ট, ১৯৫২’ অনুযায়ী একটি তদন্ত কমিশন (কমিশন অফ ইনকোয়ারি) গঠন করার সিদ্ধান্ত নেয়, যার প্রধান ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সি.এন. রামচন্দ্রন নায়ার।
২. কেরল হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও রায় (Kerala High Court’s Observations and Verdict)
ওয়াক্ফ বোর্ডের এই একতরফা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া একটি ফৌজদারি আপিলের শুনানি করে মাদ্রাজ হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ (বিচারপতি সুশ্রুত অরবিন্দ ধর্মাদিকারী এবং বিচারপতি শ্যাম কুমার ভি.এম.) একটি ঐতিহাসিক ও কড়া রায় দেয়।
হাইকোর্টের মূল পর্যবেক্ষণ:
-
ওয়াক্ফ বোর্ডের ক্ষমতার লঙ্ঘন: আদালত রায় দেয় যে বোর্ডের ২০১৯ সালের বিজ্ঞপ্তিটি ওয়াক্ফ আইন, ১৯৯৫-এর বিধানের পরিপন্থী এবং বোর্ডের আইনত ক্ষমতা বহির্ভূত (Ultra Vires)।
-
“জমি দখলের কৌশল”: আদালত বোর্ডকে কঠোর ভাষায় ভর্ৎসনা করে বলে যে বোর্ডের এই পদক্ষেপ “ধর্মীয় দানের আড়ালে জমি দখলের কৌশল ছাড়া আর কিছুই নয়”।
-
স্থায়ী উৎসর্গীকরণের অভাব: আদালত মূল ১৯৫০ সালের দলিলটি পরীক্ষা করে দেখে যে এটিকে ওয়াক্ফ এনডাওমেন্ট বলা হলেও, দলিলের শর্তাবলী প্রাপককে সম্পত্তির অংশবিশেষ নিজেদের মালিকানায় রাখা, হস্তান্তর এবং বিক্রি করার অধিকার দিয়েছিল। আদালত সিদ্ধান্ত নেয় যে একটি বৈধ ওয়াক্ফের জন্য আবশ্যিক যে “স্থায়ী উৎসর্গীকরণ” (Permanent Dedication) প্রয়োজন, তা এই দলিলে অনুপস্থিত। তাই এটি ওয়াক্ফ ডিড নয়, বরং একটি ‘গিফট ডিড’ (দানপত্র)।
-
তদন্ত কমিশন বহাল: আদালত রাজ্য সরকারের তদন্ত কমিশন গঠনের সিদ্ধান্তকে সঠিক বলে গণ্য করে এবং এই কমিশনকে পুনর্বহাল করার নির্দেশ দেয়। হাইকোর্ট স্পষ্ট করে যে বোর্ড একতরফা ঘোষণা করলেই সরকার তাতে আবদ্ধ নয় এবং তৃতীয় পক্ষের সম্পত্তির অধিকার সুরক্ষার জন্য রাজ্যের হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা রয়েছে।
৩. সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ ও বর্তমান অবস্থা (Supreme Court’s Observations and Current Status)
কেরল হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে ‘কেরল ওয়াক্ফ সংরক্ষণ বেদি’ সুপ্রিম কোর্টে স্পেশাল লিভ পিটিশন (SLP) দায়ের করে। ১২ই ডিসেম্বর, ২০২৫-এ বিচারপতি মনোজ মিশ্র এবং বিচারপতি উজ্জ্বল ভূঁইয়া-এর বেঞ্চে মামলাটির শুনানি হয়।
সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত:
-
নোটিশ জারি: সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে নোটিশ জারি করে।
-
হাইকোর্টের রায়ের উপর স্থগিতাদেশ: আদালত হাইকোর্টের সেই ঘোষণার ওপর স্থগিতাদেশ (Stay) দেয়, যেখানে মুন্নামবাম জমিকে ওয়াক্ফ সম্পত্তি নয় বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। এর ফলে, মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত হাইকোর্টের প্রধান রায়টি কার্যকর হবে না।
-
তদন্ত কমিশন বহাল: তবে, সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্টভাবে জানায় যে মুন্নামবাম জমি সংক্রান্ত বিষয়ে একটি তদন্ত কমিশন গঠনের জন্য হাইকোর্টের অনুমোদনের ওপর কোনো স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়নি। এর অর্থ হলো, ওয়াক্ফ বোর্ডের কাজের ওপর তদন্ত প্রক্রিয়া চালু থাকবে।
-
স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ: আদালত মুন্নামবাম জমির ক্ষেত্রে স্থিতাবস্থা (Status Quo) বজায় রাখার নির্দেশ দেয়।
বর্তমান পরিস্থিতি:
সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে ওয়াক্ফ বোর্ডের ঘোষণার ওপর হাইকোর্টের রায় আপাতত স্থগিত হলো, যার ফলে আইনি লড়াইয়ের আরও একটি পর্ব শুরু হলো। তবে, মুন্নামবাম জমিতে বোর্ডের কার্যকলাপের ওপর তদন্ত কমিশন তাদের কাজ চালিয়ে যেতে পারবে।



