স্টেট অফ ওয়েস্ট বেঙ্গল বনাম বেলা ব্যানার্জি (১৯৫৪): ভূমি অধিগ্রহণ ও ‘ক্ষতিপূরণ’-এর সংজ্ঞা

মামলার শিরোনাম: State of West Bengal v. Bela Banerjee and Others মামলার রেফারেন্স: AIR 1954 SC 170 আদালত: ভারতের সুপ্রিম কোর্ট রায়ের তারিখ: ১৭ ডিসেম্বর, ১৯৫৪ তৎকালীন সংবিধানের ধারা: অনুচ্ছেদ ৩১ (Right to Property)
মামলার প্রেক্ষাপট ও মূল প্রশ্ন (The Background and Key Issue)
ভারতীয় সংবিধান কার্যকর হওয়ার পরপরই ১৯৫১ সালে সম্পত্তি অধিকারকে মৌলিক অধিকারের মর্যাদা দেওয়া হয় (অনুচ্ছেদ ৩১)। এই প্রেক্ষাপটে, পশ্চিমবঙ্গ সরকার ‘দ্য বেঙ্গল ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড প্ল্যানিং অ্যাক্ট, ১৯৪৮’ (The Bengal Land Development and Planning Act, 1948) আইন ব্যবহার করে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের জন্য জমি অধিগ্রহণ করছিল।
এই আইনে জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের একটি পদ্ধতি ছিল। পদ্ধতি অনুযায়ী, ক্ষতিপূরণের পরিমাণ ১৯৪৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর তারিখে জমির যে বাজার মূল্য ছিল, তার বেশি হতে পারত না। সমস্যাটি হলো, ১৯৪৮ বা তার পরবর্তী বছরগুলিতে যখন জমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছিল, তখন প্রকৃত বাজার মূল্য ১৯৪৬ সালের মূল্যের চেয়ে অনেক গুণ বেশি ছিল।
জমির মালিক বেলা ব্যানার্জি এই আইনের ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত ধারাটিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেন। মামলার মূল প্রশ্ন ছিল:
সংবিধানের ৩১(২) ধারায় উল্লিখিত ‘ক্ষতিপূরণ’ (Compensation) শব্দটির আইনি অর্থ কী? সরকার কি ইচ্ছামতো নামমাত্র বা তুচ্ছ (illusory) ক্ষতিপূরণ দিতে পারে, নাকি তা সম্পত্তির ‘ন্যায়সঙ্গত সমতুল্য’ হওয়া আবশ্যক?
আদালতের রায় ও বিশেষত্ব (The Supreme Court’s Ruling and Specialty)
বিচারপতি পাতঞ্জলি শাস্ত্রী (Chief Justice Patanjali Sastri)-এর নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ একটি যুগান্তকারী রায় প্রদান করে। আদালত স্পষ্ট করে জানায় যে, ‘ক্ষতিপূরণ’ শব্দটি কোনো arbitrary বা ইচ্ছামতো ‘মূল্য’ বোঝায় না।
আদালতের মূল সিদ্ধান্ত:
- ক্ষতিপূরণের সংজ্ঞা: আদালত রায় দেয় যে ‘Compensation’ শব্দের অর্থ হলো অধিগ্রহণ করা সম্পত্তির মূল্যের “ন্যায়সঙ্গত সমতুল্য” (Just Equivalent) হতে হবে। এটি সম্পত্তির মালিকের ক্ষতির সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ (Full Indemnification) হওয়া উচিত।
- বিচারিক পর্যালোচনা: আদালত দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করে যে, যদিও ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের ক্ষমতা আইনসভার হাতে, কিন্তু সেই ক্ষতিপূরণের পরিমাণ যদি সম্পূর্ণরূপে তুচ্ছ বা কাল্পনিক (illusory) হয়, তবে আদালত তার যথাযথতা (adequacy) বিচার করতে পারে। যদি আইন এমনভাবে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করে, যা ন্যায্য নয়, তবে আদালত সেই আইনকে সংবিধানের পরিপন্থী বলে বাতিল করে দিতে পারে।
- আইন বাতিল: যেহেতু পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ১৯৪৮ সালের আইনটি একটি নির্দিষ্ট তারিখ (১৯৪৬ সাল) ধরে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করছিল, যা প্রকৃত বাজার মূল্যের চেয়ে অনেক কম ছিল, তাই আদালত সেই আইনটির ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত ধারাটিকে সংবিধানের ৩১(২) ধারার পরিপন্থী ঘোষণা করে বাতিল করে দেয়।
কেন এটি ল্যান্ডমার্ক জাজমেন্ট? (Why it is a Landmark Judgment)
State of West Bengal v. Bela Banerjee (1954) মামলাটি নিম্নলিখিত কারণে ভারতের বিচারিক ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়:
- ক্ষতিপূরণের ‘যথাযথতা’ প্রতিষ্ঠা: এটিই ছিল প্রথম মামলা, যেখানে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্টভাবে রায় দেয় যে কেবল ক্ষতিপূরণ দিলেই হবে না, ক্ষতিপূরণের পরিমাণ (adequacy) যথেষ্ট ও ন্যায্য হতে হবে। এই রায়ের আগে মনে করা হতো, ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নির্ধারণ করা পার্লামেন্টের এক্তিয়ার।
- সরকারের ক্ষমতা সীমাবদ্ধকরণ: এই রায়টি সরকারকে উন্নয়নমূলক বা ভূমি সংস্কারের নামে কম দামে জমি অধিগ্রহণ করার ক্ষমতাকে ব্যাপকভাবে সীমাবদ্ধ করে দেয়। এর ফলে সরকার যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য জনগণের জমি অধিগ্রহণ করতে গেলে তাকে বাজার দরের কাছাকাছি ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য হয়।
- চতুর্থ সংশোধনের পটভূমি: এই রায়ের ফলেই তৎকালীন সরকার উপলব্ধি করে যে ভূমি সংস্কার এবং সামাজিক অর্থনৈতিক পরিবর্তন আনার জন্য আদালতের এই ক্ষমতা হ্রাস করা প্রয়োজন। ফলস্বরূপ, ১৯৫৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী (Fourth Amendment, 1955) আনা হয়। এই সংশোধনের মাধ্যমে ৩১(২) ধারার ‘Compensation’ শব্দটি পরিবর্তন করে ‘Amount’ (পরিমাণ) শব্দটি প্রতিস্থাপিত করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল আদালতের ক্ষতিপূরণের পরিমাণ সংক্রান্ত বিচারিক পর্যালোচনা (judicial review) করার ক্ষমতাকে কার্যত বিলুপ্ত করা।
সুতরাং, বেলা ব্যানার্জি মামলাটি সম্পত্তির অধিকারের উপর বিচার বিভাগের শক্তিশালী অবস্থানকে তুলে ধরেছিল, যা শেষ পর্যন্ত সংবিধান সংশোধনে সরকারকে বাধ্য করে এবং ভারতের আর্থ-সামাজিক ইতিহাসে গভীর প্রভাব ফেলে।



