
বিচারের আসনে বসে থাকা কোনো বিচারক বা বিচারিক কর্মকর্তা (Judicial Officer) যদি প্রশাসনিক কারণে স্থগিতাদেশের (Suspension) মুখে পড়েন, তবে সেই কারণ জানার জন্য তিনি তথ্য জানার অধিকার আইন বা RTI ব্যবহার করতে পারবেন না। গত ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫-এ একটি মামলার শুনানিতে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এই স্পষ্ট নির্দেশিকা জারি করেছে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট
মামলাটি মধ্যপ্রদেশের একজন সিনিয়র জেলা ও সেশন বিচারককে কেন্দ্র করে। ওই বিচারকের অবসরের মাত্র কয়েকদিন আগে (১৯ নভেম্বর) তাঁকে হঠাৎ স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়। কেন তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো, তা জানতে তিনি RTI আইনের অধীনে আবেদন করেন এবং একইসঙ্গে স্থগিতাদেশটিকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন। তাঁর আইনজীবীর যুক্তি ছিল, স্থগিতাদেশের কোনো আনুষ্ঠানিক কারণ বা নথিপত্র আবেদনকারীকে জানানো হয়নি।
সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ এই RTI আবেদনের বিষয়টিকে ‘অপ্রত্যাশিত’ বলে অভিহিত করেন। আদালতের মতে:
-
সঠিক পদ্ধতি: একজন বিচারক হিসেবে তাঁর উচিত ছিল যথাযথ কর্তৃপক্ষের (হাইকোর্ট বা সরকার) কাছে একটি আনুষ্ঠানিক ‘রিপ্রেজেন্টেশন’ বা আবেদন জমা দেওয়া। RTI-এর মাধ্যমে প্রশাসনিক নথি তলব করা বিচারিক পদের মর্যাদা ও শিষ্টাচারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
-
ভুল বনাম অসদাচরণ: আদালত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতি মনে করিয়ে দিয়ে বলে যে, কোনো বিচারকের দেওয়া ভুল বা ত্রুটিপূর্ণ রায়ের জন্য তাঁকে শাস্তি দেওয়া যায় না। তবে যদি সেই রায়ের পেছনে ‘স্পষ্ট অসদাচরণ’, ‘অনৈতিক উদ্দেশ্য’ বা ‘বাইরের কোনো প্রভাব’ কাজ করে, তবেই তাঁর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সঙ্গত।
‘শেষ ওভারে ছক্কা’ মারার প্রবণতা
শুনানি চলাকালীন প্রধান বিচারপতি মজার ছলে হলেও একটি বড় উদ্বেগের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, অনেক বিচারকের ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে যে, অবসরের ঠিক আগমুহূর্তে তাঁরা প্রচুর গুরুত্বপূর্ণ আদেশ জারি করেন। তিনি একে ক্রিকেটের ‘শেষ ওভারে ছক্কা’ মারার প্রবণতার সাথে তুলনা করে বলেন যে, এমন আচরণ অনেক সময় বিচারব্যবস্থায় প্রশ্ন তোলে, যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।
আদালতের সিদ্ধান্ত
সুপ্রিম কোর্ট ওই বিচারকের স্থগিতাদেশ এখনই বাতিল করতে অস্বীকার করেছে। তবে তাঁকে স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে যাতে তিনি হাইকোর্টের কাছে একটি রিপ্রেজেন্টেশন জমা দিতে পারেন। ওই আবেদন পাওয়ার পর কর্তৃপক্ষকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ারও নির্দেশ দিয়েছে সর্বোচ্চ আদালত।
সারসংক্ষেপে, এই রায় স্পষ্ট করে দিল যে বিচারিক প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে RTI নয়, বরং নির্ধারিত প্রশাসনিক পদ্ধতিই অনুসরণ করতে হবে।



