সুপ্রিমকোর্ট

সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়: ‘ওপেন’ বা ‘অসংরক্ষিত’ পদ কোনো নির্দিষ্ট কোটা নয়, এটি সবার জন্য উন্মুক্ত

২০২৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্ট এক যুগান্তকারী রায়ে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, সরকারি চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে ‘ওপেন’ (Open), ‘অসংরক্ষিত’ (Unreserved) বা ‘সাধারণ’ (General) হিসেবে চিহ্নিত শূন্যপদগুলো কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির জন্য সংরক্ষিত নয়। এই পদগুলো সম্পূর্ণভাবে মেধার ভিত্তিতে পূরণ করতে হবে এবং এখানে যেকোনো শ্রেণির প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন।

মামলার প্রেক্ষাপট: রাজস্থান হাইকোর্টে ক্লার্ক এবং জুনিয়র জুডিশিয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট নিয়োগের একটি প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে এই আইনি লড়াই শুরু হয়। দেখা গিয়েছিল যে, এসসি (SC), ওবিসি (OBC) বা ইডব্লিউএস (EWS) শ্রেণির অনেক প্রার্থীর প্রাপ্ত নম্বর সাধারণ বা জেনারেল ক্যাটাগরির কাট-অফ মার্কসের চেয়ে বেশি ছিল। তা সত্ত্বেও, শুধুমাত্র সংরক্ষিত শ্রেণির হওয়ার কারণে তাঁদের ‘ওপেন’ ক্যাটাগরির তালিকায় জায়গা দেওয়া হয়নি। এর ফলে কম নম্বর পেয়েও অনেক সাধারণ শ্রেণির প্রার্থী পরবর্তী ধাপের (টাইপিং টেস্ট) জন্য সুযোগ পান, কিন্তু বেশি নম্বর পেয়েও সংরক্ষিত শ্রেণির মেধাবী প্রার্থীরা বাদ পড়েন।

সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ ও রায়: বিচারপতি দিপাঙ্কর দত্ত এবং বিচারপতি অগাস্টিন জর্জ মাসিহ-র বেঞ্চ এই প্রথাকে অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করেন। আদালতের প্রধান পর্যবেক্ষণগুলো হলো:

১. মেধাই শেষ কথা: আদালত জানিয়েছে, ‘ওপেন’ ক্যাটাগরি মানে হলো এমন একটি জায়গা যেখানে জাত-পাত বা লিঙ্গ নির্বিশেষে যে কেউ নিজের যোগ্যতায় স্থান করে নিতে পারেন। যদি কোনো সংরক্ষিত শ্রেণির প্রার্থী সাধারণ প্রার্থীর সমান বা বেশি নম্বর পান, তবে তাঁকে সাধারণ ক্যান্ডিডেট হিসেবেই গণ্য করতে হবে।

২. স্ক্রিনিং পর্যায়ের নিয়ম: নিয়োগের প্রাথমিক ধাপ বা স্ক্রিনিং পর্যায়েও মেধাবী সংরক্ষিত প্রার্থীদের ‘জেনারেল’ তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যাবে না। যদি তা করা হয়, তবে ‘ওপেন’ ক্যাটাগরি আদতে সাধারণ প্রার্থীদের জন্য একটি ‘সংরক্ষিত কোটা’য় পরিণত হবে, যা ভারতের সংবিধানের ১৪ ও ১৬ নম্বর অনুচ্ছেদের (সমতার অধিকার) পরিপন্থী।

৩. সংরক্ষণের সঠিক প্রয়োগ: আদালত স্পষ্ট করেছে যে, যদি কোনো মেধাবী সংরক্ষিত প্রার্থী জেনারেল ক্যাটাগরিতে স্থান পান, কিন্তু তাঁর নিজের সংরক্ষিত কোটার মাধ্যমে তিনি আরও ভালো কোনো পদ বা পছন্দের পোস্টিং পাওয়ার অধিকারী হন, তবে তাঁকে সেই সুযোগ দিতে হবে। অর্থাৎ মেধা যেন প্রার্থীর জন্য আশীর্বাদ হয়, অভিশাপ নয়।

উপসংহার: এই রায়ের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট পুনরায় নিশ্চিত করল যে, সংরক্ষণ ব্যবস্থা মেধার পথে বাধা নয়। ‘অসংরক্ষিত’ পদের অর্থ হলো এটি মেধার জন্য উন্মুক্ত একটি প্রাঙ্গণ, যেখানে দেশের যেকোনো নাগরিক তাঁর যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে চাকরি পেতে পারেন। এই নির্দেশিকা দেশের সমস্ত সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং ন্যায্যতা বজায় রাখতে সাহায্য করবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button