
গাড়ির ঋণের কিস্তি বা ইএমআই (EMI) সময়মতো পরিশোধ না করলে ফিন্যান্স কোম্পানি বা ব্যাংক যদি সেই গাড়িটি নিজেদের দখলে নেয়, তবে তাকে কোনোভাবেই ‘চুরি’ বা ‘ডাকাতি’ হিসেবে গণ্য করা যাবে না। সম্প্রতি একটি মামলার শুনানিতে কলকাতা হাইকোর্ট এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছে। আদালত স্পষ্ট করেছে যে, ঋণের চুক্তিতে যদি গাড়ি পুনরুদ্ধারের অধিকার ব্যাংকের থাকে, তবে তা দণ্ডবিধির আওতায় কোনো অপরাধ নয়।
মামলার প্রেক্ষাপট ও বিচারপতির নাম
এই রায়টি দিয়েছেন কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি অজয় কুমার মুখোপাধ্যায় (Justice Ajoy Kumar Mukherjee)। ২০২৫ সালের একটি মামলা— ‘প্রান্তিক চক্রবর্তী বনাম পশ্চিমবঙ্গ সরকার ও অন্যান্য’ (Prantik Chakraborty vs. The State of West Bengal & Anr.)— শুনানি চলাকালীন তিনি এই পর্যবেক্ষণ দেন। কাকদ্বীপ থানায় দায়ের হওয়া (মামলা নং ৩৩/২০২৪) এবং পরবর্তীতে নিম্ন আদালতে চলা জিআর মামলা (জিআর মামলা নং ৩৬৯/২০২৪) বাতিল করার আবেদন জানিয়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল।
ঘটনার বিবরণ
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০২৩ সালের মার্চ মাসে আবেদনকারী প্রান্তিক চক্রবর্তী ইন্ডাসইন্ড ব্যাংক (IndusInd Bank Ltd.) থেকে প্রায় ২৭ লক্ষ ৯৮ হাজার ৯৪৩ টাকা ঋণ নিয়ে একটি গাড়ি কেনেন। সুদসহ তাঁকে মোট ৩৬ লক্ষ ১৩ হাজার ৪৩৫ টাকা ফেরত দিতে হতো। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, তাঁকে মোট ৫৮টি কিস্তিতে এই অর্থ শোধ করার কথা ছিল।
কিন্তু আবেদনকারী সময়মতো ইএমআই পরিশোধ করতে ব্যর্থ হন। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ১১ ডিসেম্বর ২০২৩-এ তাঁকে আইনি নোটিশ পাঠালেও বকেয়া টাকা শোধ হয়নি। এরপরই ঋণের চুক্তির ৮ এবং ১২(ii) ধারা অনুযায়ী, ২৭ জানুয়ারি ২০২৪ তারিখে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ গাড়িটি পুনরায় নিজেদের দখলে (Repossession) নেয় এবং আবেদনকারীকে সে কথা জানিয়ে দেয়। এর প্রেক্ষিতেই থানায় চুরির অভিযোগ দায়ের করা হয়েছিল।
আদালতের যুক্তি ও সিদ্ধান্ত
বিচারপতি অজয় কুমার মুখোপাধ্যায় ২০০১ সালে সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া একটি ঐতিহাসিক রায়ের (Charanjit Singh Chadha vs. Sudhir Mehra) কথা স্মরণ করিয়ে দেন। সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্টভাবে বলেছিল যে, কিস্তি না মেটানো পর্যন্ত গাড়ির প্রকৃত মালিকানা থাকে ঋণদাতার কাছেই। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী কিস্তি খেলাপির কারণে গাড়ি পুনরুদ্ধার করা চুরির সামিল নয়।
হাইকোর্ট জানায়, বন্ধক বা ‘Hypothecation Agreement’ অনুযায়ী, গাড়িটি ঋণের জামানত হিসেবে কাজ করে। ইএমআই সম্পূর্ণ শোধ না হওয়া পর্যন্ত ঋণগ্রহীতা গাড়ির পূর্ণ মালিকানা দাবি করতে পারেন না। অতএব, গাড়িটি ফিরিয়ে নেওয়া ব্যাংকের আইনি অধিকারের মধ্যে পড়ে। এই যুক্তিতে হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের মামলাটি খারিজ করে দেয়।
রায়ের গুরুত্ব
এই রায়ের ফলে ব্যাংক এবং ফিন্যান্স সংস্থাগুলির বড় জয় হলো। অনেক সময় ঋণগ্রহীতারা কিস্তি মেটাতে না পেরে গাড়ি ফিরিয়ে নেওয়ার ঘটনাকে ‘চুরি’ হিসেবে থানায় অভিযোগ করেন। এই রায়ে স্পষ্ট হলো যে, যদি চুক্তিতে কিস্তি না মেটানোর কারণে গাড়ি জব্দের শর্ত থাকে, তবে পুলিশের কাছে করা চুরির অভিযোগ টিকবে না। এর আগে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে এইচডিএফসি ব্যাংকের একটি মামলাতেও কলকাতা হাইকোর্ট একই ধরনের পর্যবেক্ষণ দিয়েছিল, যা এই রায়ে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হলো।



