সুপ্রিমকোর্ট

স্বামীর আর্থিক নিয়ন্ত্রণ মানেই ‘ক্রুরতা’ নয়: ধারা ৪৯৮এ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের বড় রায়

দাম্পত্য জীবনে আর্থিক টানাপোড়েন বা স্ত্রীর খরচের ওপর স্বামীর নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি সবসময় ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে না। সম্প্রতি এক মামলার রায়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়েছে, কোনো স্বামী যদি তার স্ত্রীর অর্থ বা পারিবারিক খরচের হিসাব রাখেন বা নিয়ন্ত্রণ করেন, তবে তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘ক্রুরতা’ (Cruelty) বলা যাবে না। এটি অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে হলে মানসিক বা শারীরিক ক্ষতির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকা আবশ্যক।

মামলার প্রেক্ষাপট

তেলেঙ্গানার এক দম্পতির বিবাহিত জীবনে অশান্তির জেরে মামলাটি শুরু হয়। ওই স্ত্রী তার স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৯৮এ (498A IPC) ধারা এবং যৌতুক নিরোধক আইনে অভিযোগ দায়ের করেন। স্ত্রীর অভিযোগ ছিল:

  • স্বামী তার নিজের মা-বাবার কাছে টাকা পাঠাতেন কিন্তু স্ত্রীকে হাতখরচ বা বাড়ির খরচের জন্য পর্যাপ্ত টাকা দিতেন না।

  • স্ত্রীকে বাড়ির প্রতিটি পয়সার হিসাব রাখার জন্য ‘এক্সেল শিট’ (Excel Sheet) তৈরি করতে বাধ্য করতেন।

  • তাকে প্রায়ই আর্থিক এবং মানসিক হয়রানির শিকার হতে হতো।

তেলেঙ্গানা হাইকোর্ট এই অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। সেই আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে স্বামী সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেন।

সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্ত

বিচারপতিদের বেঞ্চ মামলাটি পর্যালোচনা করে নিম্নোক্ত পর্যবেক্ষণগুলো তুলে ধরেন:

১. স্বাভাবিক দাম্পত্য বিরোধ: আদালত জানায়, ঘরের বাজেটের হিসাব চাওয়া বা খরচের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকা বৈবাহিক জীবনের প্রতিদিনের সাধারণ ঝগড়া বা ‘Marital wear-and-tear’-এর অংশ হতে পারে। যতক্ষণ না এই আচরণের কারণে স্ত্রীর বড় কোনো শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি হচ্ছে, ততক্ষণ একে ৪৯৮এ ধারার অধীনে ‘ক্রুরতা’ বলা যাবে না।

২. প্রমাণের অভাব: সুপ্রিম কোর্ট লক্ষ্য করে যে, স্ত্রীর অভিযোগগুলো ছিল অত্যন্ত অস্পষ্ট ও সাধারণ। সেখানে কোনো সুনির্দিষ্ট তারিখ বা গুরুতর নির্যাতনের উদাহরণ ছিল না। আদালত মনে করে, সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া কেবল ‘মানসিক হয়রানি’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করে কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত করা আইনের অপব্যবহারের সমান।

৩. আইনের অপব্যবহার রোধ: শীর্ষ আদালত সতর্ক করে দিয়ে বলেছে যে, পারিবারিক বিবাদ মেটানোর জন্য বা ব্যক্তিগত প্রতিশোধ নেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে এই আইনকে ব্যবহার করা উচিত নয়। এর ফলে আইনের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়।

চূড়ান্ত রায়

সুপ্রিম কোর্ট তেলেঙ্গানা হাইকোর্টের নির্দেশ বাতিল করে দেয় এবং স্বামীর বিরুদ্ধে দায়ের করা FIR-টি পুরোপুরি খারিজ করে দেয়। আদালত পুনর্ব্যক্ত করে যে, আর্থিক আধিপত্য দাম্পত্য জীবনে অপ্রীতিকর হতে পারে, কিন্তু পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়া তা ফৌজদারি অপরাধ নয়।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button