সম্পাদকীয়

ইরান কি তিন টুকরো হওয়ার পথে, যুক্তরাষ্ট্রের গোপন প্ল্যান

পূর্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়-  একটা সময় ছিল যুদ্ধের রীতি নীতি মানা হত। সমাজ ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ ছিল অবশ্যাম্ভাবী। আধুনিক সময়ে যুদ্ধ সেই নীতি নৈতিকতাকে ছাপিয়ে ক্ষমতা কায়েমের অস্ত্র হয়ে উঠেছে।

সম্প্রতি ইরানের সঙ্গে ইজরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ এক অদ্ভুত টালমাটাল পরিস্থিতিতে দাঁড় করিয়েছে গোটা বিশ্বকে। যখন কোনও অহঙ্কারী ব্যক্তি বা রাষ্ট্র প্রধানের হাত থেকে নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা আলগা হতে শুরু করে, তখন সেই রাষ্ট্র এক বিচিত্র কৌশল নিয়ে থাকে। যা মানব সভ্যতার ক্ষেত্রে ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। আর একই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের দুই চরিত্র যখন যুযুধান শিবিরে উত্তীর্ণ হয়, তখন সারা বিশ্বই এক অন্ধকারময় পতনের দিকে চলতে থাকে।

দ্বিতীয় দফায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি মসনদে আসীন হওয়ার পরেই এক কুখ্যাত উন্মাদ ঐতিহাসিক চরিত্রের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। মহম্মদ বিন তুঘলক। তিনি কখন কী ভাবেন, কখন কী করেন, কেউই কিছু আন্দাজ করতে পারেন না। এমনকী তাঁর সভাসদরাও নন। তিনি ক্ষমতায় আসার আগে বলেছিলেন, ইউক্রেন রাশিয়া যুদ্ধ বন্ধ করবেন, পারেননি।

তিনি নাকি ভারত পাকিস্তানের যুদ্ধ বন্ধ করিয়ে দিয়েছেন। শান্তিতে নোবেল পাওয়ার জন্য তিনি কত প্রচার, প্রসার, প্রভাব বিস্তার করেছেন, সেখানেও কিছু হাসিল করতে পারেননি। অবশেষে তিনি যেটা করতে চলেছেন, বিশ্বকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। কারণটা স্পষ্ট, উদ্দেশ্য একাদিক রয়েছে, বিশ্ব বাজারে যুক্ররাষ্ট্র মুদ্রা ডলারকে একছত্র আধিপত্যবাদের ক্ষমতায় ধরে রাখা, বিশ্বের তৈল ভাণ্ডারের মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা ধরে রাখা, এমনকী দেশীয় প্রযুক্তি, অস্ত্রের বাজার নিজেদের দখলে রাখা।

ইরানকে নিয়ে ত্রিমুখী পরিকল্পনা

ইরানের বিরুদ্ধে মূল লড়াইটা ছিল পরমাণু বোমাকে কেন্দ্র করে। ইরান যাতে পরমাণু শক্তিধর না হয়ে উঠতে পারে তার মরিয়া চেষ্টা চালিয়েছে ইজরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সাফল্য পেয়েছে তারা, পরমাণু গবেষণা কেন্দ্রগুলি তছনছ করে দেওয়া হয়েছে। পরের লক্ষ্য ছিল তৈল ভান্ডার দখলে মসনদ পরিবর্তন করা। সেই লক্ষ্যেও সাফল্য এসেছে, খতম করে দিয়েছেন ইরানের প্রধান নেতা আয়াতুল্লা আলি খোমেনিসহ শীর্ষ পদে থাকা একাধিক নেতাকে। ট্রাম্প মনে করেছিলেন, এবার হয়তো বদল আসবে ইরানে। পালাবদল হবে, কিন্তু সেই স্বপ্ন ভঙ্গ হয়েছে। সিংহ গর্জন করে হামলা চালিয়েছে। কিন্তু শিকারটি ছিল সজারু। তাঁর কাঁটা সিংহের মুখে বিঁধে গিয়েছে। খোমেনির পরবর্তী নেতৃত্বের উত্থান হয়েছে। তাহলে কি যুক্তরাষ্ট্র পিছ পা হবে?

যীশুর নবজন্মের অপেক্ষায়

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কয়েক মাস আগে পর্যন্ত নিজেকে ভেবে নিয়েছিলেন, তিনিই ঈশ্বর। কিন্তু ইরান নামক যুদ্ধক্ষেত্রের চক্রব্যুহে তিনি এখন অভিমন্যু। নতুন করে আস্থা রাখতে চলেছেন যীশুর উপরে, তিনি দেশের সেনাকর্মীদের উদ্বুদ্ধ করছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এক নতুন ধর্মযুদ্ধ। প্রভু যীশুর নির্দেশে তিনি এই কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন। তাই দেশবাসীকেও সমর্থন দিতে হবে। এমন একটি ভাবনা যখন এক বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের প্রধান বলেন, তখন বুঝতে আর বাকি থাকে না।

ট্রাম্পের সমস্ত পরিকল্পনা চুরমার হয়ে গিয়েছে। ইরানকে তিনি বাগে আনতে পারবেন না। আর ট্রাম্পের এই পদক্ষেপের ফলে, গোটা বিশ্বই এখন দাঁড়িয়ে এক অদ্ভুত দীঘির কিনারায়। যেখানে জলে কুমীর আর ডাঙায় বাঘ। অর্থাৎ, ইরান যদি জিতে যায়, তাহলে, তালিবানের মতোই বিশ্বের কোনায় কোনায় আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে, ইসলামিক কট্টরপন্থী সন্ত্রাসীরা। যার প্রভাব বড় আকার নেবে এশিয়াতেও। আর আমেরিকা যদি মসনদ পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়, তাহলে আগামী কয়েক দশক এশিয়ার ভবিষ্যত এক অদ্ভুত জালে জড়িয়ে যাবে।

যুক্তরাষ্ট্রের মরণকামড়

বর্তমানে ইরান- যুক্তরাষ্ট্র ইউরায়েলের যুদ্ধ পরিস্থিতি যে দিকে যাচ্ছে, বোঝাই যাচ্ছে যুদ্ধ লম্বা চলবে। আর ইরানে যদি ক্ষমতা পরিবর্তন করতে না পারে, তাহলে ইরানকে ভেঙে দেওয়ার গোপন রণনীতি রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। ইরানে প্রধানত চারটি বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী রয়েছে, খুজেস্তানি, কুর্দিস্তানি, ইরানি-আজারবাইজান এবং বালোচ। অতি সম্প্রতি রিপোর্ট বলছে, ইরান- যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে, সক্রিয় হচ্ছে এই গোষ্ঠীগুলি। যারা ইরান সেনার বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে রণক্ষেত্রে নামছে। মজার বিষয় হচ্ছে, ইরানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেটো সদস্যদের আহ্বান জানিয়েছেন ট্রাম্প। আর সেই ডাকে গড়িমসি করছে ফ্রান্স ও ব্রিটেন। কেন, কীসের ইঙ্গিত?

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button