
মাদ্রাজ হাইকোর্ট সম্প্রতি একটি যুগান্তকারী পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে যে, হিন্দুধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার জন্য কোনও আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় অনুষ্ঠানের প্রয়োজন নেই। ধর্মান্তরের আন্তরিকতা এবং ধারাবাহিক আচরণই যথেষ্ট। এই রায়ের মাধ্যমে আদালত একটি দম্পতির পারস্পরিক সম্মতিতে বিবাহবিচ্ছেদের (Mutual-Consent Divorce) আবেদন বহাল রাখার নির্দেশ দিয়েছে, যা পূর্বে নিম্ন আদালত খারিজ করে দিয়েছিল।
মামলার পটভূমি ও নিম্ন আদালতের ভুল
মামলাটি ছিল এক দম্পতির বিবাহবিচ্ছেদ সংক্রান্ত। স্ত্রী জন্মসূত্রে মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও, তাঁরা হিন্দু বিবাহ আইন, ১৯৫৫ (HMA)-এর ১৩(বি) ধারার অধীনে পারস্পরিক সম্মতিতে বিবাহবিচ্ছেদের জন্য আম্বাট্টুর সাব কোর্টে আবেদন করেছিলেন। সাব কোর্ট এই আবেদনটি খারিজ করে দেয়। আদালতের যুক্তি ছিল, হিন্দু বিবাহ আইনের ২ ধারা অনুযায়ী এই আইন মুসলিমদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। যেহেতু স্ত্রী জন্মসূত্রে মুসলিম, তাই এই বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন গ্রহণযোগ্য নয়।
হাইকোর্টের রায় এবং যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা
নিম্ন আদালতের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দম্পতি মাদ্রাজ হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। হাইকোর্টে বিচারপতি পি.বি. বালাজি-এর বেঞ্চ স্পষ্টভাবে জানায় যে, একজন ব্যক্তির হিন্দু ধর্মে ধর্মান্তর কেবল জন্ম পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে না। যদি কোনো ব্যক্তি আন্তরিকভাবে হিন্দু ধর্মকে গ্রহণ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন এবং তার জীবনযাপন বা আচরণের মাধ্যমে সেই উদ্দেশ্য প্রমাণিত হয়, তবে তাকে হিন্দু হিসেবে গণ্য করা হবে এবং তাঁর ক্ষেত্রে হিন্দু বিবাহ আইন প্রযোজ্য হবে।
আদালতের সামনে দম্পতি প্রমাণ দেন যে, স্ত্রী জন্মসূত্রে মুসলিম পিতামাতার সন্তান হলেও তিনি তাঁর মাতামহীর কাছে হিন্দু ঐতিহ্য ও রীতিনীতিতে বড় হয়েছেন এবং সারা জীবন হিন্দু হিসাবেই জীবনযাপন করেছেন। তাঁরা আরও জানান, তাঁদের বিবাহটি ২১ আগস্ট ২০২০ তারিখে চেন্নাইয়ের একটি মন্দিরে হিন্দু আচার-অনুষ্ঠান মেনেই সম্পন্ন হয়েছিল। বিবাহের ছবি এবং মন্দিরের শংসাপত্রও আদালতে জমা দেওয়া হয়।
এই প্রসঙ্গে হাইকোর্ট সুপ্রিম কোর্টের পূর্ববর্তী একটি ঐতিহাসিক রায়—পেরুমাল নাদার বনাম পোন্নুস্বামী (AIR 1971 2352)-এর ওপর নির্ভর করে। সুপ্রিম কোর্ট এই রায়ে বলেছিল, ধর্মান্তরের জন্য ‘কোনো আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানের’ প্রয়োজন নেই। হাইকোর্ট সিদ্ধান্ত নেয় যে, বিবাহবিচ্ছেদের জন্য হিন্দু বিবাহ আইনের আশ্রয় নেওয়া এবং হিন্দু রীতিতে বিবাহ করার মাধ্যমে স্ত্রীর ‘সুস্পষ্ট আচরণ’ প্রমাণ করে যে তিনি হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করেছেন।
আদালত আরও পর্যবেক্ষণ করে, যেহেতু বিবাহটি হিন্দু আচার-অনুযায়ী হয়েছিল, তাই দম্পতি বিশেষ বিবাহ আইন (Special Marriage Act) এর অধীনেও কোনো সুরাহা চাইতে পারতেন না। ফলে হিন্দু বিবাহ আইনই তাদের জন্য উপযুক্ত আইনি পথ। কেবল জন্ম পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে নিম্ন আদালত মামলাটি খারিজ করার ক্ষেত্রে ভুল করেছিল।
নির্দেশ
হাইকোর্ট আম্বাট্টুর সাব কোর্টকে নির্দেশ দেয়, চার সপ্তাহের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদনটি পুনরায় বহাল করতে হবে এবং তা গুণাগুণের ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করতে হবে। এই রায়ের মাধ্যমে মাদ্রাজ হাইকোর্ট স্পষ্ট করে দিল যে, ধর্মান্তরের ক্ষেত্রে ‘বিশ্বাস’ এবং ‘আচরণ’ই মূল ভিত্তি, কোনো কঠোর আনুষ্ঠানিকতা নয়।



