আইনশিক্ষা

ভারতীয় আইন অনুসারে বিবাহবিচ্ছেদ হতে কত সময় লাগে? রইল পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন

হিন্দু আইনে বিবাহবিচ্ছেদের সময়কাল: একটি বিশদ প্রতিবেদন

ভারতে হিন্দু বিবাহ আইন, ১৯৫৫ (Hindu Marriage Act, 1955) অনুযায়ী বিবাহবিচ্ছেদের প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়। বিবাহবিচ্ছেদ হতে ঠিক কত সময় লাগবে, তা নির্দিষ্টভাবে বলা সম্ভব নয়, কারণ এটি প্রধানত দুটি ভিন্ন পদ্ধতির উপর নির্ভর করে: পারস্পরিক সম্মতিতে বিবাহবিচ্ছেদ (Mutual Consent Divorce) এবং বিবাদপূর্ণ বিবাহবিচ্ছেদ (Contested Divorce)।

১. পারস্পরিক সম্মতিতে বিবাহবিচ্ছেদ (Mutual Consent Divorce – ধারা 13B)

পারস্পরিক সম্মতিতে বিবাহবিচ্ছেদ হলো সবচেয়ে দ্রুততম প্রক্রিয়া। এক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী উভয়েই বিবাহবিচ্ছেদের জন্য সম্মত হন এবং তাঁরা নিজেদের মধ্যে ভরণপোষণ, সন্তানের হেফাজত (Custody) এবং সম্পত্তির ভাগ-বাটোয়ারা সংক্রান্ত সমস্ত শর্তাবলী স্থির করে নেন।

  • প্রয়োজনীয় সময়কাল: প্রক্রিয়াটি সাধারণত ৬ থেকে ১৮ মাস সময় নেয়।

  • প্রথম প্রস্তাব (First Motion): দায়ের করার পর আদালত দম্পতিদের ৬ মাসের জন্য অপেক্ষা করার (Cooling-off Period) নির্দেশ দেন। এই সময়ের উদ্দেশ্য হলো তাঁরা যেন তাঁদের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে পারেন।

  • ৬ মাসের অপেক্ষা (Waiting Period): এই ৬ মাস সময়টি বাধ্যতামূলক। যদিও সুপ্রিম কোর্ট কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে এই সময়কাল কমানোর অনুমতি দিতে পারে, যদি খুব কম সময়ের মধ্যে বিচ্ছেদের কোনো সুযোগ না থাকে।

  • দ্বিতীয় প্রস্তাব (Second Motion): ৬ মাস শেষ হওয়ার পর (কিন্তু ১৮ মাসের মধ্যে), দম্পতিকে দ্বিতীয় প্রস্তাবের জন্য আবেদন করতে হয়। এই প্রস্তাবের উপর ভিত্তি করে আদালত ১ থেকে ২ মাসের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদের রায় (Decree of Divorce) জারি করে।

  • মোট সময়: আদর্শ পরিস্থিতিতে, প্রথম প্রস্তাব দায়েরের তারিখ থেকে এটি ৭-৯ মাসের মধ্যে শেষ হতে পারে।


২. বিবাদপূর্ণ বিবাহবিচ্ছেদ (Contested Divorce – ধারা 13)

যখন স্বামী বা স্ত্রীর মধ্যে যেকোনো একজন বিবাহবিচ্ছেদ চান কিন্তু অন্য পক্ষ তাতে সম্মত হন না, তখন এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। এটি নিষ্ঠুরতা, পরকীয়া, পরিত্যাগ, বা মানসিক রোগের মতো নির্দিষ্ট আইনি ভিত্তির (Grounds) উপর নির্ভর করে।

  • প্রয়োজনীয় সময়কাল: এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত দীর্ঘ এবং জটিল হতে পারে। এটি সাধারণত ২ বছর থেকে ৫ বছর বা তার বেশি সময় নিতে পারে।

  • জটিলতার কারণ:

    • প্রমাণ ও সাক্ষ্য: উভয় পক্ষকে তাদের অভিযোগ প্রমাণের জন্য সাক্ষ্য এবং প্রমাণ পেশ করতে হয়। এক্ষেত্রে সাক্ষীদের জেরা (Cross-Examination) সহ আইনি তর্ক-বিতর্ক চলে।

    • অন্তর্বর্তীকালীন আবেদন (Interim Applications): মামলার শুনানির সময় অন্তর্বর্তীকালীন ভরণপোষণ (Interim Maintenance), সন্তানের হেফাজত বা ভিজিটেশনের জন্য আবেদন করা হলে মামলার সময়কাল আরও বাড়ে।

    • আপিল প্রক্রিয়া: যদি নিম্ন আদালতের রায়ে কোনো পক্ষ অসন্তুষ্ট হন, তবে তাঁরা উচ্চ আদালত (হাই কোর্ট বা সুপ্রিম কোর্ট) পর্যন্ত আপিল করতে পারেন, যা প্রক্রিয়াটিকে কয়েক বছর পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেতে পারে।

    • আদালতের ব্যস্ততা: বিচারকের প্রাপ্যতা এবং আদালতের কাজের চাপও সময়কালকে প্রভাবিত করে।

সময় কমানোর কৌশল

সময়কাল কমানোর জন্য পক্ষেরা আদালতের বাইরে মধ্যস্থতা (Mediation) বা লোক আদালতে (Lok Adalat) সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করতে পারেন। এছাড়া, হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করে দ্রুত শুনানির (Expeditious Hearing) ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

মূল বিষয়

বিবাহবিচ্ছেদের সময়কাল মূলত নির্ভর করে দম্পতির মধ্যে সহযোগিতা এবং আদালতের বাইরে সমাধানের প্রচেষ্টার উপর। পারস্পরিক সম্মতির প্রক্রিয়াটি দ্রুত হলেও, বিবাদপূর্ণ মামলায় আইনি লড়াইয়ের জটিলতা সময়কে অনেক বাড়িয়ে তোলে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button