রাজস্থান হাইকোর্টের রায়: প্রাপ্তবয়স্ক হলেই সম্মতিতে লিভ-ইন করা যাবে, বিয়ের বয়স না হলেও বাধা নেই

রাজস্থান হাইকোর্ট সম্প্রতি একটি যুগান্তকারী রায়ে জানিয়েছে যে, দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী ও পুরুষ যদি স্বেচ্ছায় একে অপরের সাথে লিভ-ইন সম্পর্কে (Live-in Relationship) থাকতে চান, তবে তাদের বিয়ের বয়স না হলেও আইনত কোনো বাধা নেই। আদালত স্পষ্ট করেছে যে, বিয়ের বয়স এবং সহবাসের বা একসঙ্গে থাকার অধিকার—দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
ঘটনার পটভূমি: মামলাটি দায়ের করেছিলেন এক তরুণ যুগল যারা একে অপরকে ভালোবাসেন এবং নিজেদের ইচ্ছায় একসঙ্গে বসবাস করতে চান। এই মামলায় প্রেমিকা প্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন, কিন্তু তার সঙ্গী প্রেমিক যুবকটির বয়স ছিল ১৯ বছর। ভারতীয় আইন অনুযায়ী পুরুষদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ২১ বছর। এই কারণে ওই যুবকের পরিবার এবং স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন তাদের সম্পর্কের বিরোধিতা করে। তাদের যুক্তি ছিল, যেহেতু ছেলের বয়স ২১ হয়নি, তাই তিনি বিয়ে করতে পারবেন না এবং সেই সূত্রে লিভ-ইন সম্পর্কেও থাকতে পারবেন না। পরিবারের ভয়ে ওই যুগল আদালতের দ্বারস্থ হয়ে পুলিশি নিরাপত্তার আবেদন জানান।
রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি: আদালতে সরকারি আইনজীবী এবং বিরোধী পক্ষ যুক্তি দেয় যে, হিন্দু বিবাহ আইন অনুযায়ী বরের বয়স ২১ বছর এবং কনের বয়স ১৮ বছর হতে হবে। যেহেতু এই মামলায় ছেলের বয়স বিয়ের যোগ্য নয়, তাই তাদের একসঙ্গে থাকাটা আইনের চোখে বৈধ হতে পারে না এবং তাদের পুলিশি নিরাপত্তা দেওয়া উচিত নয়।
আদালতের পর্যবেক্ষণ ও রায়: বিচারপতি অনুপ কুমার ধান্ড-এর বেঞ্চ এই যুক্তি খারিজ করে দেন। আদালত সুপ্রিম কোর্টের একাধিক নজির (যেমন—নন্দকুমার বনাম কেরালা রাজ্য মামলা) উল্লেখ করে একটি ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ দেন। আদালত বলেন:
১. প্রাপ্তবয়স্ক বনাম বিয়ের বয়স: যদিও হিন্দু বিবাহ আইন (১৯৫৫)-এর ৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী বিয়ের জন্য ছেলের বয়স ২১ হওয়া বাধ্যতামূলক, কিন্তু লিভ-ইন সম্পর্কের জন্য বা একসঙ্গে থাকার জন্য প্রাপ্তবয়স্ক হওয়াই যথেষ্ট। ভারতে ১৮ বছর বয়স হলেই একজন ব্যক্তিকে ‘প্রাপ্তবয়স্ক’ বা ‘মেজর’ হিসেবে গণ্য করা হয়। এই মামলায় ছেলেটির বয়স ১৯, অর্থাৎ তিনি আইনত প্রাপ্তবয়স্ক।
২. অনুচ্ছেদ ২১-এর অধিকার: ভারতের সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ প্রত্যেক নাগরিককে ‘জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার’ (Right to Life and Personal Liberty) অধিকার দিয়েছে। আদালত জানায়, দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ কার সাথে থাকবেন বা কীভাবে জীবন কাটাবেন, তা তাদের মৌলিক অধিকার। সমাজ বা পরিবার তাদের এই ব্যক্তিগত পছন্দে হস্তক্ষেপ করতে পারে না।
৩. বিয়ে না হলেও সুরক্ষা: আদালত স্পষ্ট করে দেয় যে, ওই যুগল বিয়ে করতে না পারলেও, প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে তারা স্বেচ্ছায় লিভ-ইন সম্পর্কে থাকতেই পারেন। বিয়ের বয়স হয়নি—এই অজুহাতে তাদের জীবনকে বিপন্ন করা যাবে না বা তাদের সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।
নির্দেশ: আদালত পুলিশ প্রশাসনকে কড়া নির্দেশ দেয় যে, ওই যুগলের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তাদের পরিবারের কেউ যেন তাদের ওপর কোনো শারীরিক নির্যাতন বা জোরজবরদস্তি করতে না পারে, তা দেখার দায়িত্ব পুলিশের। আদালত আরও বলে, এই সম্পর্ককে সমাজ কীভাবে দেখল তা বিচার্য নয়, সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করাই আদালতের কাজ।
এই রায়টি ভারতের তরুণ প্রজন্মের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি নিশ্চিত করে যে ২১ বছর না হলেও, ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে যেকোনো যুবক তার সঙ্গীর সাথে থাকার আইনি অধিকার রাখেন।



