আইনশিক্ষা

ভারতীয় সংবিধানের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ (Salient Features of the Constitution of India)

LLB 1st Year 1 Semester Constitution of INDIA

১. পৃথিবীর দীর্ঘতম লিখিত সংবিধান (World’s Longest Written Constitution)

ভারতের সংবিধান হলো বিশ্বের সবচেয়ে বড় এবং বিস্তারিত লিখিত সংবিধান। এটি গঠনের সময়, সংবিধানটিতে ৩৯৫টি ধারা, ২২টি অংশ এবং ৮টি তফসিল (Schedule) ছিল। বর্তমানে, বিভিন্ন সংশোধনী বা অ্যামেন্ডমেন্টের মাধ্যমে এর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে প্রায় ৪৭০টিরও বেশি ধারা, ২৫টি অংশ এবং ১২টি তফসিল। এর বিশদতার প্রধান কারণগুলি হলো:

  • বিশাল ভূগোল ও বৈচিত্র্য: ভারত একটি বিশাল দেশ, যার মধ্যে অসংখ্য ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম এবং ভৌগোলিক বৈচিত্র্য রয়েছে। এই বৈচিত্র্যকে একসূত্রে বাঁধতে বিস্তারিত বিধানের প্রয়োজন ছিল।

  • কেন্দ্র ও রাজ্যের জন্য একক সংবিধান: ভারতে কেন্দ্র ও রাজ্যের জন্য একটিই সংবিধান রয়েছে, যা উভয় স্তরের সরকারের কাঠামো ও ক্ষমতা নির্ধারণ করে।

  • ঐতিহাসিক প্রভাব: ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের (Government of India Act, 1935) বিশাল অংশ এতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

  • বিস্তারিত প্রশাসনিক বিধান: কেবল মৌলিক নীতি নয়, প্রশাসন পরিচালনার বিস্তারিত নিয়মাবলীও সংবিধানে স্থান পেয়েছে।

২. বিভিন্ন উৎস থেকে গৃহীত (Drawn from Various Sources)

ভারতীয় সংবিধানকে প্রায়শই “ধার করা বস্তার” (Bag of Borrowings) সঙ্গে তুলনা করা হয়। সংবিধান প্রণেতারা বিভিন্ন দেশের সংবিধান থেকে প্রয়োজনীয় এবং উপযোগী ধারণাগুলি গ্রহণ করে সেগুলিকে ভারতের প্রেক্ষাপটে অভিযোজিত করেছেন।

  • ভারত শাসন আইন, ১৯৩৫: যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো, বিচার বিভাগ, জরুরি ক্ষমতা, সরকারি কার্যালয়ের বিবরণ।

  • ব্রিটেন: সংসদীয় শাসনব্যবস্থা, একক নাগরিকত্ব, আইনের শাসন, মন্ত্রিসভার নীতি।

  • মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র: মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনা (Judicial Review), প্রস্তাবনা, উপরাষ্ট্রপতির পদ।

  • কানাডা: শক্তিশালী কেন্দ্রসহ যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা, কেন্দ্রের হাতে অবশিষ্ট ক্ষমতা (Residuary Powers)।

  • আয়ারল্যান্ড: রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতি (Directive Principles of State Policy – DPSP)।

৩. নমনীয়তা ও অনমনীয়তার মিশ্রণ (Blend of Flexibility and Rigidity)

ভারতের সংবিধান নমনীয় (Flexible) এবং অনমনীয় (Rigid) – এই দুই ধরনের বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়।

  • নমনীয় অংশ: কিছু অংশ সাধারণ আইন প্রণয়নের মতোই সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার (Simple Majority) মাধ্যমে সংশোধন করা যায় (যেমন নতুন রাজ্য গঠন)। এটি ব্রিটেনের সংবিধানের মতো নমনীয়।

  • অনমনীয় অংশ: বেশিরভাগ অংশের জন্য সংসদের বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা (Special Majority – দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন) প্রয়োজন।

  • খুব অনমনীয় অংশ: কিছু মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য সংসদের বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতার পাশাপাশি অর্ধেকের বেশি রাজ্য আইনসভার অনুমোদন প্রয়োজন (যেমন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতি)। এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের মতো অনমনীয়।

৪. সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা (Parliamentary Form of Government)

ভারতে ওয়েস্টমিনিস্টার মডেলের সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা (Parliamentary System) চালু রয়েছে, যা ব্রিটেনের অনুকরণে তৈরি। এই ব্যবস্থাকে মন্ত্রিসভা সরকার (Cabinet Government) বা দায়বদ্ধ সরকার (Responsible Government) ও বলা হয়।

  • নামমাত্র ও প্রকৃত শাসক: রাষ্ট্রপতি হলেন নামমাত্র শাসক (De Jure Head), এবং প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর মন্ত্রিসভা হলো প্রকৃত শাসক (De Facto Head)।

  • আইনসভা ও শাসন বিভাগের সহযোগিতা: শাসন বিভাগের সদস্যরা আইনসভারও অংশ হন।

  • সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের শাসন: যে দল লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়, তারা সরকার গঠন করে।

  • সামগ্রিক দায়িত্বশীলতা: মন্ত্রিসভা সম্মিলিতভাবে লোকসভার কাছে দায়বদ্ধ থাকে।

৫. যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোসহ এককেন্দ্রিকতার ঝোঁক (Federal System with Unitary Bias)

ভারতীয় সংবিধান প্রকৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রীয় (Federal), যেখানে দুটি সরকার (কেন্দ্র ও রাজ্য), ক্ষমতা বন্টন, লিখিত সংবিধান এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রয়েছে। তবে, এতে এককেন্দ্রিকতার (Unitary) বেশ কিছু বৈশিষ্ট্যও বিদ্যমান, যেমন:

  • শক্তিশালী কেন্দ্র।

  • একক সংবিধান ও নাগরিকত্ব।

  • জরুরি অবস্থা ঘোষণার বিধান।

  • রাজ্যপালের নিয়োগ (কেন্দ্র দ্বারা)।

  • অখন্ড বিচার বিভাগ।

ডঃ বি. আর. আম্বেদকরের মতে, ভারতের সংবিধান হলো “আধা-যুক্তরাষ্ট্রীয়” (Quasi-Federal)।

৬. মৌলিক অধিকার (Fundamental Rights)

সংবিধানের তৃতীয় অংশে (Part III) নাগরিকদের জন্য ছয়টি মৌলিক অধিকার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে (ধারা ১২ থেকে ৩৫)।

    • এই অধিকারগুলি সরকার বা ব্যক্তি দ্বারা লঙ্ঘন করা হলে, নাগরিকরা সরাসরি সুপ্রিম কোর্ট বা হাইকোর্টে যেতে পারে।

    • তবে, জরুরি অবস্থার সময় এই অধিকারগুলি (জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার ছাড়া) স্থগিত করা যেতে পারে।

৭. রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতি (Directive Principles of State Policy – DPSP)

সংবিধানের চতুর্থ অংশে (Part IV) নির্দেশমূলক নীতিগুলি দেওয়া হয়েছে।

  • এগুলি হলো সরকারের জন্য নীতিগত নির্দেশিকা, যা জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র (Welfare State) প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য পূরণে সরকারকে অনুসরণ করতে হয়।

  • এগুলি ন্যায়ালয় দ্বারা বলবৎযোগ্য নয় (Non-justiciable), অর্থাৎ লঙ্ঘিত হলে আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যায় না। তবে এগুলি দেশের শাসনকার্যে মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ।

৮. ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র (Secular State)

১৯৭৬ সালের ৪২তম সংশোধনী আইনের মাধ্যমে সংবিধানের প্রস্তাবনায় ধর্মনিরপেক্ষ শব্দটি যুক্ত করা হয়।

  • এর অর্থ হলো, রাষ্ট্রের কোনো সরকারি ধর্ম নেই

  • রাষ্ট্রের চোখে সকল ধর্ম সমান এবং রাষ্ট্র সকল ধর্মকে সমান সম্মান ও সুরক্ষা দেয়।

৯. একক নাগরিকত্ব (Single Citizenship)

যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো থাকা সত্ত্বেও ভারতে একক নাগরিকত্বের ব্যবস্থা রয়েছে (ব্রিটেনের অনুকরণে)।

  • এর অর্থ হলো, একজন ব্যক্তি কেবল ভারতের নাগরিক এবং তাকে আলাদা করে কোনো রাজ্যের নাগরিকত্ব নিতে হয় না।

  • এটি জাতীয় ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখতে সাহায্য করে।

১০. স্বাধীন ও অখণ্ড বিচার বিভাগ (Independent and Integrated Judiciary)

ভারতে বিচার বিভাগ হলো স্বাধীন এবং অখণ্ড (Integrated)।

  • অখণ্ডতা: সুপ্রিম কোর্ট শীর্ষে এবং তার নিচে হাইকোর্ট ও অন্যান্য অধস্তন আদালত রয়েছে।

  • স্বাধীনতা: বিচারকদের নিয়োগ, কার্যকাল, এবং বেতন-ভাতার ক্ষেত্রে কার্যনির্বাহী বিভাগের হস্তক্ষেপ থেকে বিচার বিভাগকে মুক্ত রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে বিচার বিভাগ সংবিধানের অভিভাবক (Guardian of the Constitution) হিসেবে কাজ করতে পারে।

১১. ত্রিস্তরীয় সরকার (Three-Tier Government)

মূলত সংবিধান কেন্দ্র ও রাজ্য স্তরে সরকার গঠনের কথা বললেও, ১৯৯২ সালে ৭৩তম ও ৭৪তম সংশোধনী আইনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার বা তৃতীয় স্তরের সরকার যুক্ত করা হয়।

  • ৭৩তম সংশোধনী: পঞ্চায়েতি রাজ (গ্রামীণ স্থানীয় সরকার)।

  • ৭৪তম সংশোধনী: পৌরসভা (শহুরে স্থানীয় সরকার)।

এই বৈশিষ্ট্যগুলো একত্রে ভারতীয় সংবিধানকে একটি গতিশীল, প্রগতিশীল এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button