
ভারতের বিচারব্যবস্থা কি শুধুই বিত্তবান বা ক্ষমতাবানদের জন্য? এই দীর্ঘকালীন প্রশ্ন ও সংশয় দূর করতে বদ্ধপরিকর দেশের নবনিযুক্ত প্রধান বিচারপতি (CJI) সূর্য কান্ত। সম্প্রতি এক জনসভায় তিনি সাধারণ মানুষের জন্য বিচারব্যবস্থাকে আরও সহজলভ্য, দ্রুত এবং সাশ্রয়ী করার এক অভাবনীয় রূপরেখা পেশ করেছেন। তাঁর স্পষ্ট বার্তা—সুপ্রিম কোর্ট হবে দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য ন্যায়ের এক অটল ও নির্ভরযোগ্য ঠিকানা।
দ্রুত বিচার ও নির্দিষ্ট সময়সীমার অঙ্গীকার
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত গত ২৪ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে ভারতের ৫৩তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি মামলার দীর্ঘসূত্রতা কমাতে ‘প্রেডিক্টেবল টাইমলাইন’ বা সুনির্দিষ্ট সময়সীমার ওপর জোর দিচ্ছেন। তাঁর মতে, মামলার শুনানি থেকে রায় ঘোষণা—সবকিছুর একটি নির্দিষ্ট সময় থাকা জরুরি, যাতে বিচারপ্রার্থীকে বছরের পর বছর আদালতের বারান্দায় ঘুরে ক্লান্ত হতে না হয়। এতে সাধারণ মানুষের সময় ও অর্থের সাশ্রয় হবে এবং বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা ফিরবে।
সাশ্রয়ী বিচার ও আইনি সহায়তা
দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের কাছে আদালতের খরচ মেটানো প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। এই সমস্যা সমাধানে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত ‘লিগ্যাল এইড’ বা নিখরচায় আইনি সহায়তাকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি চান, একজন সাধারণ নাগরিক যেন কেবল অর্থের অভাবে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হন। আইনজীবীর খরচ থেকে শুরু করে আদালতের অন্যান্য ব্যয় যাতে সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে থাকে, সেই লক্ষ্যে বড়সড় সংস্কারের ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
কেস লিস্টিং ও মিডিয়েশনে নতুন দিগন্ত
আদালতের প্রশাসনিক সংস্কারে প্রধান বিচারপতির অন্যতম বড় পদক্ষেপ হতে চলেছে ‘প্রায়োরিটাইজেশন’ বা অগ্রাধিকার ভিত্তিক মামলার তালিকা। অনেক সময় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মামলা আগে প্রাধান্য পায়, কিন্তু এখন থেকে সাধারণ মানুষের ছোট ছোট অথচ গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলি যাতে পিছনে পড়ে না থাকে, তা নিশ্চিত করা হবে। এছাড়া, দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের বদলে ‘মিডিয়েশন’ বা আলোচনার মাধ্যমে বিবাদ নিষ্পত্তির ওপর তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। এতে আদালতের মামলার বোঝা কমবে এবং উভয় পক্ষ দ্রুত সমাধানে পৌঁছাতে পারবে।
কেন এই পরিবর্তন জরুরি?
বর্তমানে ভারতের আদালতগুলিতে কোটি কোটি মামলা বিচারাধীন। অনেক সাধারণ মানুষ বিচারের দীর্ঘসূত্রতা এবং বিপুল খরচের ভয়ে আইনি পথে হাঁটতে ভয় পান। প্রধান বিচারপতির এই সংস্কারগুলি বাস্তবায়িত হলে প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী সহজেই ন্যায়ের দ্বারস্থ হতে পারবে। প্রযুক্তি ও আইনকে মানুষের সহানুভূতি ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে যুক্ত করাই তাঁর মূল লক্ষ্য।
ভবিষ্যতের প্রত্যাশা
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের এই মানবিক ও জনমুখী দৃষ্টিভঙ্গি বিচারব্যবস্থায় এক নতুন সূর্যোদয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদি এই প্রতিশ্রুতিগুলি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে ন্যায়বিচার কেবল ‘বিশাল ইমারতে’ সীমাবদ্ধ না থেকে সাধারণ নাগরিকের ঘরের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাবে। যারা আগে মামলা করতে ভয় পেতেন, তারা এবার বুক বেঁধে ন্যায়ের জন্য এগিয়ে আসতে পারবেন।



